যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেহরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলা চালানো হবে। একই সময়ে টানা চতুর্থ দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে তাদের জন্য পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। তারা যদি আলোচনায় না আসে, তাহলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সব সেতু ধ্বংস করে দেব।’ তিনি আরও জানান, জ্বালানি অবকাঠামোতেও শেষ পর্যন্ত হামলা চালানো হতে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলেও তিনি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। সে সময় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক সতর্ক করে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষ ও তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনেও বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, মঙ্গলবার রাতে মার্কিন আলোচকরা ইরানকে বার্তা দিয়েছেন, ‘চুক্তি করো, নইলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের কার্গো পরিবহনের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের পূর্বঘোষণা থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। এর পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ‘বৃহৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি’ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, ‘আমি ২০ শতাংশ ফি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল বিনিয়োগ করবে, যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।’ যদিও এসব সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইরান ছাড়া সব দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।’ পরে ওয়াশিংটনে ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ রক্ষার পুরো দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একার হওয়া উচিত নয় এবং উপসাগরীয় নেতাদের অনুরোধের পরই তিনি ফি আরোপের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা চালাতে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে নতুন করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তার মতে, এ পর্যন্ত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
পরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করে, দুটি ট্যাংকার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখে মাইন পাতা একটি পথ দিয়ে অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল।
বুধবার ভোরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের ছোড়া ড্রোন প্রতিহত করছে। একই সময়ে বাহরাইনজুড়ে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইরান এর আগে জানিয়েছিল, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ট্যাংকারেও আঘাত হানার কথা স্বীকার করেছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুললেও ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে তাদের উপস্থিতি প্রয়োজন।