স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আবেগঘন এক ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা নিশ্চিত করেছেন, চলমান বিশ্বকাপই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।
স্থানীয় সময় সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আরলিংটনে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে সংবাদ সম্মেলনে রোনালদো বলেন, ‘আমি এই বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে চাই। এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ। তবে আশা করি, আগামীকালের ম্যাচটাই যেন আমার শেষ ম্যাচ না হয়।’
রোনালদো ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—মোট ৬টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন। চলতি আসরের গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের ৬টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
আগামী ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর অন্যতম হবে তার নিজের দেশ পর্তুগাল। যৌথভাবে স্পেন ও মরক্কোর সঙ্গে এই আসরের আয়োজন করবে পর্তুগাল।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের প্রসঙ্গে রোনালদো বলেন, ‘একদিন সেই সময় অবশ্যই আসবে। তবে সত্যি বলতে, আগামীকাল যা-ই হোক না কেন, আমি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বিবেক নিয়ে মাঠ ছাড়ব। শতভাগ নয়, হাজারভাগ তৃপ্তি নিয়ে বিদায় নেব। কারণ ফুটবলের জন্য আমি আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। আমার কোনো কিছুর অভাব নেই, আমি ভালো জীবন কাটাচ্ছি। কিন্তু ফুটবল আমার ভালোবাসা, আমার আবেগ। তাই এখনো খেলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি দিন উপভোগ করতে হবে। এই বিশ্বকাপে আমি ইতোমধ্যে তিনটি গোল করেছি। খুব একটা খারাপ তো করছি না, তাই না?’
গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোল করার পর বত্রিশ দলের পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে আরও একটি গোল করেন রোনালদো। এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার প্রথম গোল।
চলতি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা। শুধু মাঠের খেলার কারণে নয়, মানুষের ভালোবাসা ও আবেগের কারণেও এই বিশ্বকাপ আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আগের যেকোনো আসরের চেয়ে এবার আবেগের অনুভূতি আরও গভীর ছিল। আমি প্রতিটি মুহূর্ত ভীষণ উপভোগ করেছি।’
২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতানো এই কিংবদন্তি মনে করেন, বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তার অর্জনের খাতা অসম্পূর্ণ থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে কোনো কিছুর অভাব নেই। বিশ্বকাপ জিতলে আমি বড় মানুষ হব না, আর না জিতলেও ছোট হয়ে যাব না। আমাদের এই শিরোপা জেতার সামর্থ্য আছে। তবে শেষ পর্যন্ত একটি দেশই চ্যাম্পিয়ন হবে। বয়স মানুষকে পরিণত করে, অভিজ্ঞতা দেয়।’
সমালোচনা প্রসঙ্গে রোনালদো বলেন, ‘চল্লিশ বছর পেরিয়েও আমি যেসব সমালোচনার মুখোমুখি হই, সেগুলোর জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। আমি আশা করি আরও চল্লিশ বছর বাঁচব। গঠনমূলক সমালোচনা মানুষকে আরও পরিণত করে। তাই সাংবাদিকদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।’
স্পেনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সম্পর্কে রোনালদো বলেন, ‘তার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তবে আমি সবসময় পুরো স্পেন দলকেই দেখি। তারা সবাই দারুণ মানের খেলোয়াড়। দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখতে হবে। সমালোচনায় কান দিলে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন,‘সব সমালোচনা এক রকম নয়। কিছু সমালোচনা মানুষকে উন্নতির পথ দেখায়, আবার কিছু কেবল ভেঙে দেওয়ার জন্য করা হয়। দীর্ঘ পথ চলতে চাইলে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে এবং যারা আপনাকে ভালোবাসে, তাদের ভালোবাসা ও নিজের আবেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। সময়ের সঙ্গে আমি এটাই শিখেছি।’
এদিকে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে রোনালদোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
তিনি বলেন,‘আমি রোনালদোর একজন ভক্ত। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দৃঢ় মানসিকতা এবং প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করার যে অদম্য ইচ্ছা তার মধ্যে রয়েছে, তা তরুণদের জন্য অনুকরণীয়।’
তিনি আরও বলেন,‘ম্যাচজুড়ে আমাদের তাকে নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে সব সময় একজন খেলোয়াড়কে শুধু তার দায়িত্বে রাখা হবে। তবে তার অসাধারণ প্রতিভা ও সামর্থ্যের কারণে তাকে কোনো মুহূর্তেই অবহেলা করা যাবে না। নিজের অবস্থানে সে এখনো অন্যতম সেরা ফুটবলার।’