আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতে এবারের বাজেটকে সরকার বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। বলা হচ্ছে, গতবারের তুলনায় বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ। সংখ্যার হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে বড় অঙ্ক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বরাদ্দ বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে? বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করলেই স্বাস্থ্যসেবার কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসে না; প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, সুশাসন এবং কাঠামোগত সংস্কার।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাত বরাবরই অবহেলিত। বহু বছর ধরে জাতীয় বাজেটের খুব সামান্য অংশ এই খাতে বরাদ্দ হয়েছে। আবার ঘোষিত বাজেটের বড় অংশ কেটে নিয়ে বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে সেটা কমে। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ যত বড়ই দেখাক, বাস্তবে স্বাস্থ্য খাত সেই অর্থের পূর্ণ সুবিধা পায়নি। এবারের বাজেটেও সেই শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, বছরের মাঝপথে নানা অজুহাতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বলা হয়েছে- ‘টাকা খরচ করা যায়নি।’
এই যুক্তি আসলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ একটি মন্ত্রণালয় কেন বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারবে না? অন্য মন্ত্রণালয়গুলো যদি বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন পারবে না? এর অর্থ হচ্ছে, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। দক্ষ জনবল, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া স্বাস্থ্য খাতকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। অর্থ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব না দিয়ে অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবার দেখা যায়, এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, এমনকি বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছেন এমন ব্যক্তিকে অন্যত্র পদায়ন করা হয়। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘোষণাপত্রে বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে- জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনও সেই লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছানো যায়নি। বরং প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ এখনও অনেক কম। যদি সত্যিই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে আগামী বছর বা তার পরের বছরের জন্য অপেক্ষা না করে, মৌলিক সংস্কারে বিনিয়োগ এখনই শুরু করতে হবে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাকেন্দ্রিক হয়ে আছে। অথচ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন- এসব খাতে জোর না দিলে হাসপাতাল বাড়িয়েও জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে না। এখনও দেশের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট প্রকট। অনেক হাসপাতাল ভবন আছে, কিন্তু সেবা নেই। কারণ সেখানে পর্যাপ্ত জনবল নেই কিংবা নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন সেখানে থাকেন না। এই সংকট দূর করতে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গঠন, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এবং আলাদা ‘বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস’ গঠন- এসব প্রস্তাব বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের কথা ২০১১ সালের স্বাস্থ্যনীতি থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন রিপোর্টসহ বহুবার শুনছি। এটা হয়নি। এটা হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী এগোতে পারত।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন চিকিৎসক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগদান করলেও নানা প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যের কারণে দ্রুত শহরমুখী হওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তিনি দেখেন, অন্যরা সহজেই বদলি হয়ে রাজধানীতে চলে আসছেন। ফলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা চিরকালই জনবল সংকটে পড়ে থাকে। অথচ স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক নিয়োগব্যবস্থা চালু হলে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতো এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদে সেখানে ধরে রাখাও সহজ হতো। স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সংকট হলো চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অবমূল্যায়ন। প্রায়ই হাসপাতালের ভেতরে রোগীর স্বজনদের হামলা, অপমান কিংবা অযাচিত হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতার দায় অনেক সময় পুরোপুরি চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। একজন চিকিৎসকের কাছে যদি প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি কিংবা সময়ই না থাকে, তাহলে তিনি কীভাবে মানসম্মত সেবা দেবেন? জরুরি বিভাগে একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক সংকটাপন্ন রোগী সামলাতে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই সীমাবদ্ধতা দেখতে পায় না; তারা কেবল ফলাফল দেখে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি তাদের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কেবল দোষারোপ, শাস্তির ভয় কিংবা বিরূপ প্রচারণা দিয়ে কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয় না।
একইভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকেও প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। সরকার যদি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, তাহলে সাধারণ মানুষ কম খরচে চিকিৎসা পেতে পারে। সরকার নির্ধারিত প্যাকেজের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা কিনে জনগণকে স্বাস্থ্য কার্ডের ভিত্তিতে চিকিৎসা দিলে সরকারি ও বেসরকারি- দুই খাতের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে।
এছাড়া সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে হামসহ বিভিন্ন রোগের পুনরুত্থান আমাদের সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এবং শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রমে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতকে ঘিরে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- সরকার কি সত্যিই স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার চায়, নাকি কেবল বড় অঙ্কের বাজেট দেখিয়ে আবার বছর শেষে তা কেটে দিয়ে কমিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়? কারণ বাস্তবতা হচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া বাড়তি বরাদ্দও শেষ পর্যন্ত কেটে নেওয়া ও অপচয় করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আর সাময়িক সমাধান দিয়ে চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, শক্তিশালী জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জনগণের জন্য সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নইলে প্রতিবছর বাজেট বাড়বে, আলোচনা হবে কিন্তু সাধারণ মানুষের চিকিৎসা-দুর্ভোগের বাস্তবতা বদলাবে না।
ড. মুশতাক হোসেন : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর
মতামত লেখকের নিজস্ব