চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ছয় মাস আগে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক তদন্তকাজও শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। শুরুতে এ নিয়ে তৎপরতা চললেও প্রায় পাঁচ মাস স্থবির হয়ে আছে প্রক্রিয়া। বিচারের উদ্যোগেও একপ্রকার ভাটা পড়েছে। ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার ওয়াকিবহাল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তারা বলছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়টি এখন আলোচনাতেই নেই। বিএনপি সরকারের তরফে এ বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত বা নির্দেশনাও তারা পাননি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে হবে গোটা দেশ জুড়ে এবং সেটি হবে যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চারজন প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থার তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। কথা বলে নিকট ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারকাজ শুরু হবে, এমন সম্ভাবনাও নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত বছরের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে। এতে কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক দল মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন, অপরাধ সংঘটনে আদেশ, চেষ্টা ও সহায়তা, উসকানি, মদদ দেওয়া, ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতা করে তবে, সেই সংগঠন বা দলের কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করা, নিবন্ধন স্থগিত ও বাতিলসহ এর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান আইনে যুক্ত করা হয়। ওই সরকারের এমন তৎপরতায় জুলাই শহীদ পরিবার, রাজনৈতিক মহলসহ প্রসিকিউশনের অনেকে ধারণা করেছিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে বিচার শুরু হতে পারে।
প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার বরাতে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ৬৪ জেলায় তদন্ত হবে। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যে কয়েকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল সে সময় তাদের কার্যক্রমের যাবতীয় নথি, তাদের শাসনামল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখা বই, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান দমনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং সেই সরকারের কার কী ভূমিকা ছিল, কীভাবে ব্যাপক হত্যাকা-, নির্যাতন চালানো হয়েছে, দেশি-বিদেশি কোন কোন ব্যক্তি এসবের সঙ্গে জড়িত সে সবের তথ্য, ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করা হবে। আর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেবেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ ভুক্তভোগীরা।
ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে গত বছরের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটরের (সমন্বয়ক) উদ্দেশ্যে একটি কমপ্লেইন ফাইল (তদন্ত শুরু করার তাগিদ) দেওয়া হয়। পরে এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। আরেকজন প্রসিকিউটর বলেন, প্রসিকিউটরদের বলা হয়েছিল আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য তাদের মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ব্যক্তিপর্যায়ে বিচার নিয়ে তুমুল ব্যস্ততা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এসব নানা কারণে আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়টি এখন চাপা পড়ে গেছে। তদন্তকাজও স্থবির হয়ে গেছে বলে জানান ওই প্রসিকিউটর।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের ধরন, প্রক্রিয়া ও সময় প্রসঙ্গে একাধিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি একটি বড় মামলা। নথি হবে হাজার হাজার পৃষ্ঠার। আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, দেশি-বিদেশি শক্তির ইন্ধন ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া খোঁজা হবে। এজন্য বই, নথি ও সাক্ষী জোগাড় করা, ভলিউম লেখা, যাচাই করাÑ সব মিলিয়ে যথেষ্ট সময় লাগবে। এরপর আসবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের বিষয় এবং সেটি খুব সহজ হবে না, এটা নিশ্চিত।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করা হলেও তদন্তকাজ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করিনি। এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। আমাদের প্রতি কোনো নির্দেশনা বা তাগিদও আসেনি।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত সময়সাপেক্ষ হবে অবশ্যই।’ সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত কার্যক্রম চালাতে গিয়ে দেখা গেল, বিষয়টি (তদন্ত) হবে অনেকটা সমুদ্রে পানি সেচার মতো। কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর বেশি কিছু হয়নি।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘৬৪ জেলায় আমরা যদি তিনদিন করেও ভিজিট করে তথ্য, প্রমাণ ও সাক্ষী সংগ্রহ করি তাতেও ২০০ দিন লেগে যাবে। ফলে তদন্ত শুরু হলেও কবে শেষ হবে তা বলা যাবে না।’
আওয়ামী লীগের বিচারের লক্ষ্যে তদন্তের অংশ হিসেবে আরও কয়েক মাস আগেই ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয় বলে জানান প্রসিকিউশনের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে কিছু ডিজিটাল সাক্ষ্য আমাদের সংগ্রহে আছে। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাসহ ব্যক্তিবিশেষের মামলায় যেসব ভিডিও, অডিও ডিজিটাল সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার অনেক কিছুই আওয়ামী লীগের বিচারের সময় উপস্থাপন করা যাবে। তবে, এখন পর্যন্ত প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
গণঅভ্যুত্থান দমনে ব্যাপক দমন ও পীড়নে হাজারের বেশি মানুষ হত্যার অভিযোগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা এবং সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদ-ের রায় হয়েছে। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও দুটি মামলায় ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুম, হত্যার মতো কিছু মামলা রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে।
আওয়ামী লীগের বিচারের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও তার সাড়া মেলেনি। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এখনো কার্যক্রম গুছিয়ে আনছেন। আওয়ামী লীগের তদন্তের বিষয়ে এই মুহূর্তে তার কোনো ধারণা নেই। সরকারের তরফেও এ বিষয়ে প্রসিকিউশনে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনে আছে দল ও সংগঠনের বিচার করা যাবে। এগুলোর বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। শিগগির সংসদ বসছে। এখন এই অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সংসদের কী সিদ্ধান্ত হবে সেটা আমরা দেখি।’ অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলার রায় হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ মামলাগুলো কী অবস্থায় আছে সবগুলো আমার কাছে এলে পরে দেখা যাবে।’