মুরগির বাজারদর কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার মধ্যেই আবারও বেড়েছে পোলট্রি ফিডের দাম। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের মুরগির খাবারের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে।
মুরগির বাজারদর কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার মধ্যেই আবারও বেড়েছে পোলট্রি ফিডের দাম। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের মুরগির খাবারের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে।
প্রান্তিক ও ছোট খামারিদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়লে লোকসান সামাল দিতে না পেরে অনেকে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন।
তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে তিন হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মান ও ধরনভেদে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির খাবারের দামে প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পার্থক্য রয়েছে।
উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ ফিডে : পোলট্রি খামারিদের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত মুরগির খাবার। কোনো কোনো খামারির হিসাবে, উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চলে যায় খাবারের পেছনে।
খামারিরা বলছেন, ফিডের দাম বাড়লেও মুরগির দাম সব সময় সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে বাজারে মুরগির দাম কমে গেলে লোকসানের বড় অংশ তাঁদেরই বহন করতে হয়।
চুয়াডাঙ্গার এআর জোয়ার্দার অ্যাগ্রোর মালিক টি আই এম জাজিদুর রহিম জোয়ার্দার কালের কণ্ঠকে বলেন, মুরগির ফিড তৈরিতে প্রায় ৬০ শতাংশ ভুট্টা ও ২০ শতাংশ সয়াবিন মিল ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি এ দুই কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ফিডের উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
গাজীপুরের পোলট্রি ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বাবুল বলেন, বর্তমানে বাজারে ব্রয়লার স্টার্টার ও গ্রোয়ার ফিডের ৫০ কেজির বস্তা তিন হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ৫০ কেজির লেয়ার ফিড দুই হাজার ৯৫০ টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার ১০০ টাকা হয়েছে।
আমদানিনির্ভর কাঁচামাল : পোলট্রি ফিড তৈরির প্রধান উপাদান ভুট্টা ও সয়াবিন মিল। এর পাশাপাশি চালের কুঁড়া, ক্যানোলা মিল, গমের আটা, লবণ, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজসহ ১৫ থেকে ২০ ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসব উপকরণের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের ওঠানামার প্রভাব পড়ে ফিডের দামে।
মুরগির খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নারিস পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারির কর্মকর্তা নুরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ভুট্টার নিজস্ব উৎপাদনের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। এখন সবাইকে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দামও বেড়ে গেছে। আগে ভুট্টার কেজি ছিল ২৯ থেকে ৩০ টাকা। এখন সেটি বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে।’
তিনি জানান, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি—এই চার মাস দেশে স্থানীয় ভুট্টার সরবরাহ কম থাকে। এ কারণে সাধারণত এ সময় ভুট্টার দাম বাড়ে। কিন্তু এবার তার আগেই দাম বেড়েছে। আমদানি করা ভুট্টার সঙ্গে দেশের ভুট্টা মিশিয়ে ফিড তৈরি করা হয়। এ কারণে কাঁচামালের দাম কেজিতে ৯ টাকা বাড়লেও তাঁরা ফিডের দাম মাত্র দুই টাকা বাড়িয়েছেন। মুরগির খাবার তৈরিতে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভুট্টা লাগে বলে তিনি জানান। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে নিবন্ধিত পোলট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এর বাইরে আরো প্রায় দুই লাখ অনিবন্ধিত খামার রয়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে মোট ডিম উৎপাদন হয় দুই হাজার কোটিরও বেশি। বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার থেকে প্রতিদিন তিন কোটি ৫০ লাখ থেকে চার কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবারগুলোর পালন করা মুরগি থেকেও প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি ডিম আসে।
খামারিরা বলছেন, ছোট খামার কমে গেলে উৎপাদনব্যবস্থায় বড় কম্পানির নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়তে পারে। এতে প্রান্তিক খামারিদের স্বাধীনভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করার সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারে পড়তে পারে প্রভাব : উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার চাপ মুরগি ও ডিমের বাজারেও পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজারদর কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসার পর ফিডের এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এরই মধ্যে ডিমের দাম বেড়ে গেছে। খামারিদের অভিযোগ, ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ালে সেই বাড়তি ব্যয় মেনে নেওয়া ছাড়া তাঁদের বিকল্প থাকে না। এ কারণে ফিডের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।