মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অধরাই ৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্বল অর্থনীতি, ব্যাংক খাতের অনাদায়ী ঋণ, অর্থপাচার, দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো বড় সংকট উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তবে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন দলিল তৈরি করা হয়নি।

গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথা বলেন।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, গত ছয় মাসে ৩১টি অর্থনৈতিক সূচক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাত্র ১২টিতে উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে ১৯টি সূচকে অবনতি হয়েছে। শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের পুরোপুরি মিল নেই। মজুরি বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি।

সিপিডির হিসাবে, সরকার ঘোষিত নয়, বাস্তবে নেওয়া ৩৬২টি পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা হয়েছে। সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শিল্প-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে এসব পদক্ষেপ মূল্যায়ন করা হয়।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘প্রলম্বিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের’ দিকে যাচ্ছে। এক বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক উত্তরণ সম্পন্ন হবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ব্যাংকিং খাতের সংকট, জ্বালানি সমস্যা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হতে পারে।

তারমতে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা দুটিই জরুরি। শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই হবে না, বিনিয়োগকারীর মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপের অভাব। ব্যাংকিং, রাজস্ব, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। সরকারের সামনে রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতকে ব্যয় সংকোচনের ধাক্কা থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও সার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানির দিকে যেতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির জন্য টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্যের অভাব নেই; সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, সমন্বয় ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন বাড়েনি। সরকার চাইলে দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে পারত। বিষয়টি যত দীর্ঘায়িত হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারের অনেক ‘ইঙ্গিত’ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সমন্বিত ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, ‘অনেক আওয়াজ আছে, কিন্তু সংগীত নেই।’

সরকারের রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রকাশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে অর্থনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সক্ষমতা, সমন্বয় ও রাজনৈতিক সাহস বাড়ানো। এসব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও দীর্ঘায়িত হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, এর গুণগত মানও বিবেচনা করতে হবে। দেশের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে মজুরি, শ্রমিকের অধিকার ও কর্মপরিবেশ তুলনামূলক দুর্বল।

তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ বিদেশে গেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবাহ কমছে। তাই দেশের অভ্যন্তরে শোভন ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এ ক্ষেত্রে শিল্পায়ন ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেবা খাত ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। তবে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, উৎপাদনশীলতা, মজুরি ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা ও সিপিডির মিডিয়া সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। এ ছাড়া সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট শৌর্মি তালুকদার ও মমতাজুল জান্নাত, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট অসীর নেওয়াজ খান, জুবাইর জহির চৌধুরী, নাইমা জাহান তৃষা ও মাহদিয়া মাহমুদ তাইমা, প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট নাফিসা তারান্নুম ও খাজা মাশহাম ফাহিম এবং ইন্টার্ন মাহাথির মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ