মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলা

হামিদ দাবাশি
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
  • ৪৭ বার

‘ইরানিরা একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।’ নিউইয়র্ক টাইমস যখন ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার খবর প্রকাশ করতে বাধ্য হয়, তখন ফারসি ভাষার একটি প্রবাদ মনে পড়ে। ‘স্যুপ এতটাই নোনতা হয়ে গেছে যে, রাঁধুনিকেও তা স্বীকার করতে হচ্ছে।’

তবে সবসময় যেমন হয়, তথাকথিত ‘রেকর্ড পত্রিকা’র উদ্দেশ্য সত্য তুলে ধরা নয়। ইসরায়েলের নৃশংসতা যখন খারাপ প্রচারণা তৈরি করে, তখন তারা তথ্যকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।

নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘সরকারি কর্মকর্তা এবং সরকারবিরোধী কর্মীরা একইভাবে তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে হামলার শিকার হওয়া আরেকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।’

এ ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর। একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হওয়া কোনো বিষয় নয়, যেটিকে সরকারপন্থি ও সরকারবিরোধী বিভাজনের ভেতর ফেলে দেখা যায়। ইরান, ফিলিস্তিন কিংবা লেবাননে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলা নিছক রাজনৈতিক মতভেদের বিষয় নয়, এটি স্পষ্ট বর্বরতা।

যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট গণমাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এরই মধ্যে ইরানের ক্যাম্পাসগুলোয় কী ঘটছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় হামলার শিকার হয়েছে। ইরানি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মতে, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ধ্বংসের চেষ্টা।’

প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির সঙ্গে তুলনা করা হয় শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে। এটি পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানকার সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মরিয়ম মিরজাখানি, যিনি ২০১৪ সালে গণিতে সর্বোচ্চ সম্মানজনক ফিল্ডস মেডেল পাওয়া প্রথম নারী ও প্রথম ইরানি।’

এটাই দায়িত্বশীল প্রতিবেদন। নিউইয়র্ক টাইমসের জায়নবাদপন্থি সম্পাদক ও পাঠকরা কি আদৌ জানেন মরিয়ম মিরজাখানি কে ছিলেন? এ ধরনের গণমাধ্যমের কাজ পাঠকদের সত্য জানানো নয়, তাদের অজ্ঞতা টিকিয়ে রাখা। পরে আরও কিছু নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় হামলার শিকার হয়েছে।’

এখন পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, আমরা এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি, যাকে গবেষকরা ‘জ্ঞাননিধন’ বলে অভিহিত করেন। ইসরায়েল, যাদের সহায়তা করছে কট্টর জায়নবাদী ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিক, তারা এমন এক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করতে চাইছে, যার শিকড় ষষ্ঠ শতকের গণ্ডিশাপুর একাডেমি পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বজুড়ে ‘ইসরায়েল’ নামটি নিয়ে যে ঘৃণা বাড়ছে, এর পেছনে এটিও একটি কারণ।

শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি গণমাধ্যমও এ ধ্বংসযজ্ঞ স্বীকার করতে বাধ্য হয়। টাইমস অব ইসরায়েল লিখেছিল, ‘বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে জাদুঘরে রূপ দেবে ইরান।’ এরই মধ্যে খবরটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউনিভার্সিটি ওয়ার্ল্ড নিউজও অঞ্চলজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চলমান ধ্বংসযজ্ঞের নথি প্রকাশ করতে থাকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় ৩০টির বেশি ইরানি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসফাহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়েছে, গবেষণাগার, প্রশাসনিক ভবন, শ্রেণিকক্ষ, লেকচার হল, মসজিদ ও উপাসনালয়ও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কেন এত বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্য করা হলো? কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার স্থান নয়, এগুলো একটি সমাজের বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি।

ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, শিল্প, সমাজবিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়। ইসরায়েল চায় না তার চারপাশে শক্তিশালী ও জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে উঠুক। তাদের উদ্দেশ্য হলো পুরো অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা, যাতে নিজেদের সামরিক রাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় থাকে। ফিলিস্তিন ও লেবাননের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এখন তারা অন্য দেশগুলোতেও একই হুমকি দিচ্ছে।

ভাবুন তো, যদি ইসরায়েল ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলা চালাত, তাহলে পশ্চিমা সমাজ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাত?

অনেকে মনে করতে পারেন, এমন কিছু কখনো ঘটবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল ও তাদের সমর্থকরা বহু বছর ধরেই পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা চালিয়ে আসছে। বোমা দিয়ে নয়, অপবাদ, ভয়ভীতি, মামলা, হলুদ সাংবাদিকতা এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনের মাধ্যমে। অর্থাৎ, তারা এরই মধ্যে এ ক্যাম্পাসগুলোয় রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে ‘বোমা হামলা’ চালাচ্ছে।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও তাদের সহযোগীদের এগিয়ে নেওয়া ‘প্রজেক্ট এসথার’ আসলে আর কী, যদি না এটি আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আক্রমণের একটি পরিকল্পনা হয়? এর মাধ্যমে ক্যাম্পাসজুড়ে ভয়, আতঙ্ক ও নীরবতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেন কেউ ইসরায়েলের নৃশংস আচরণের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলতে সাহস না পায়।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন গবেষক এডওয়ার্ড সাঈদের অফিসে কি তারা অগ্নিসংযোগ করেনি, তাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে?

যদি ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষ মনে করে ইসরায়েল শুধু ফিলিস্তিনি, লেবাননি বা ইরানি বিশ্ববিদ্যালয়েই হামলা সীমাবদ্ধ রাখবে, তাহলে তারা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জায়নবাদীদের চলমান কর্মকাণ্ড খেয়াল করেনি। তারা সত্যকে ঘৃণা করে। তারা সমালোচনামূলক চিন্তাকে ভয় পায়। তারা তথ্য ও বাস্তবতাকে সহ্য করতে পারে না।

তারা চায় বিশ্ব মুখ ফিরিয়ে থাকুক, আর সেই সুযোগে তারা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করুক, লেবানন ধ্বংস করুক, ইরানে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চালাক, সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করুক এবং অন্তহীন যুদ্ধের পক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ব্যবহার করে আমেরিকানদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলুক।

যে কারণে ট্রাম্প ও কট্টর জায়নবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করছে এবং ‘প্রজেক্ট এসথার’ তৈরি করেছে, একই কারণে তারা ইরান ও ফিলিস্তিনের বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসে ইসরায়েলকে সমর্থন, অর্থ ও অস্ত্র দিচ্ছে।

প্রজেক্ট এসথারের একটি অভ্যন্তরীণ দিক রয়েছে, যেখানে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। আর একটি আন্তর্জাতিক দিক রয়েছে, যেখানে ইরান ও ফিলিস্তিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরাসরি বোমা মেরে ধ্বংস করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেন্সরশিপ, ভয়ভীতি, নীরবতা চাপিয়ে দেওয়া এবং পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আক্রমণ করা রাজনৈতিকভাবে সেই একই কাজ, যা ইরান ও ফিলিস্তিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর বোমা হামলার মাধ্যমে করা হচ্ছে।

ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই, শুধু শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র নয়। এগুলো এমন স্থান, যেখানে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে ওঠে।

শিক্ষার্থী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং নারী অধিকার আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে নাগরিক স্বাধীনতার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরায়েল এ ধরনের সংগঠিত নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ভয় পায়, কারণ এগুলো সচেতন ও সুস্থ সমাজ গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হত্যাকারী এজেন্টদের অনুপ্রবেশ, মসজিদে আগুন দেওয়া এবং কোরআন পোড়ানোর ঘটনা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের প্রকাশ ছিল না। এগুলো ছিল সংগঠিত নাগরিক সমাজকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত চেষ্টা।

উচ্চশিক্ষার বিরুদ্ধে এ অভিযান, যাকে এখন অনেকে ‘স্কলাস্টিসাইড’ বলে উল্লেখ করছেন, আরও গভীর একটি বাস্তবতার প্রতিফলন। ইসরায়েল এমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি সহ্য করতে পারে না, যেটিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে এ বর্বরতার জবাব হিসেবে কোনো ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হওয়া উচিত নয়। এর বিপরীতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বয়কট গড়ে তোলা উচিত, যতক্ষণ না তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে।

একটি ইটও ভাঙা উচিত নয়, কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা প্রশাসকের ক্ষতি হওয়া উচিত নয়।

এ প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। তাই এগুলো সংরক্ষিত থাকা উচিত, যতক্ষণ না একদিন তা তাদের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরে যায়, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের কাছে, তারা ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলিম বা অন্য যে ধর্মেরই হোক না কেন।

লেখক: নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।

মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ