সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্সের একটি সমস্যা আছে। তিনি প্রায়ই এমন লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন, যেখানে তার জেতার সম্ভাবনা কম। গত এক সপ্তাহে তিনি এমন তিনটি পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। ইরানের আলোচক, হাঙ্গেরির ভোটার এবং পোপ লিওর সঙ্গে তার অবস্থান তাকে সমালোচনা, অপমান এবং উপহাসের মুখে ফেলেছে। এগুলোর কোনোটিই তার নিজের সিদ্ধান্তে শুরু হয়নি। সবকিছুই তিনি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে।
নিজের বসের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের জন্য ভ্যান্সকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। তার জনপ্রিয়তা কমছে। ট্রাম্পের পরবর্তী উত্তরসূরি হওয়ার স্বপ্ন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার নিজের কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য ও ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তবু ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়লেও ভ্যান্স এখনো হোয়াইট হাউসের পরবর্তী সম্ভাব্য নেতা হিসেবে রয়েছেন।
তিনি ২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি আরও আড়াই বছর ট্রাম্পের হয়ে সব দোষ নিজের ওপর নেবেন এবং টিকে থাকার চেষ্টা করবেন, নাকি পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন?
অন্যদিকে ভ্যান্সের নিজের অবস্থানও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগে তিনি তার কঠোর সমালোচক ছিলেন এবং তাকে বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তিনি নিজের অবস্থান বদলে ট্রাম্পের নীতির সমর্থক হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেন এবং বিতর্কিত কিছু দাবিও সমর্থন করেন।
সংক্ষেপে বলা যায়, ভ্যান্স একজন সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক, যিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন; কিন্তু বাস্তবে ভিন্নভাবে কাজ করেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি অন্যান্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। ট্রাম্প একজন নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্টকে সরাতে পারেন না। যদিও সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর অধীনে ভ্যান্স চাইলে ট্রাম্পকে অপসারণের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারেন। কংগ্রেসের কিছু ডেমোক্র্যাট এরই মধ্যে তাকে এমন একটি বিশেষ কমিশনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা ট্রাম্পকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে।
ভ্যান্স এখন সময়ের অপেক্ষা করছেন। কিন্তু ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ব্যর্থতা এবং তার ক্রমশ অস্থির আচরণ সাধারণ মানুষের সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব ভ্যান্সের ওপরও পড়ছে। রিপাবলিকান দলের মনোনয়নের সম্ভাব্য প্রতিযোগিতায় তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, তিনি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অজনপ্রিয় ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন। নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় সাফল্য পেলে, তখন তিনি এবং অন্যান্য রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের বিরোধিতায় যেতে পারেন।
গত এক সপ্তাহে ভ্যান্স একাধিকভাবে চাপে পড়েছেন। হাঙ্গেরির নির্বাচনে পরাজয়ের মুখে থাকা ভিক্টর অরবান চেয়েছিলেন ট্রাম্প সরাসরি তার পক্ষে প্রচারণা চালান। কিন্তু ট্রাম্প পরাজয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান না, তাই তিনি ভ্যান্সকে পাঠান। এ প্রচেষ্টা ফল পরিবর্তন করতে পারেনি। বরং এটি ইউরোপের ডানপন্থি রাজনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সঙ্গে ভ্যান্সও যুক্ত হয়ে পড়েছেন।
একইভাবে, ট্রাম্প যখন ইরান ইস্যুতে সংকট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব ভ্যান্সের ওপর চাপিয়ে দেন। ইসলামাবাদের আলোচনা এক দিনের মধ্যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, কারণ ট্রাম্প ইরানের অবস্থান ও শক্তিকে ঠিকভাবে বোঝেননি এবং সামরিক চাপ তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
এ ছাড়া ভ্যান্সের নিজস্ব অভিজ্ঞতার অভাবও বড় কারণ ছিল। উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না এবং ইরান সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত ধারণাও সীমিত ছিল। ফলে তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাননি এবং বারবার ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে।
তিনি প্রথমে যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন, পরে সেটিকে সমর্থন করেন। এখন তিনি ট্রাম্পের দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার মুখ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
পোপ লিওর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের চলমান আক্রমণ ভ্যান্সের অবস্থান ও সুনামের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। প্রশাসনের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ ক্যাথলিক হিসেবে তার কাছ থেকে পোপকে সমর্থন করার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের কটু মন্তব্য ও ধর্মীয় অবমাননাকর আচরণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং বিশ্বজুড়ে খ্রিষ্টানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এর বিপরীতে ভ্যান্স বিস্ময়করভাবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব দেখিয়ে পোপের সত্যবাদিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি পোপকে শান্তির পক্ষে কথা বলা বন্ধ করতে বলেন এবং নৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে বলেন। এ মন্তব্য ছিল অযৌক্তিক। যুদ্ধ ও শান্তিকে নৈতিক প্রশ্ন নয় বলা যেমন ভুল, তেমনি খেলা ও রাজনীতি আলাদা বলে দাবি করাও অবাস্তব। এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে ট্রাম্পের আচরণ দেখলেই তা বোঝা যায়।
নিজের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে ভ্যান্স বলেন, ট্রাম্প যে ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তাকে যিশুখ্রিষ্টের মতো দেখানো হয়েছে, সেটি নাকি শুধু একটি রসিকতা। এটি বিশ্বজুড়ে বুলিদের পরিচিত অজুহাত, যখন তাদের আপত্তিকর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে পোপ যখন কিছু স্বৈরশাসকের কারণে বিশ্বজুড়ে ক্ষতির কথা বলেন, তখন তিনি ভ্যান্স ও ট্রাম্প দুজনকেই স্পষ্টভাবে সমালোচনা করেন। ফলে ভ্যান্স আবারও কঠিন অবস্থায় পড়ে যান।
একটি অস্থির সপ্তাহ শেষে স্পষ্ট যে, ট্রাম্প ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই সংকটের দিকে এগোচ্ছেন। জনঅসন্তোষ বাড়ছে। তাকে মানসিকভাবে অস্থির বলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা নয়, তবে বামপন্থি এবং বিভক্ত ডানপন্থি শিবিরের অনেকেই এখন এ মন্তব্য করছেন। ট্রাম্প নিজেকে সুস্থ দাবি করলেও অনেক আমেরিকান তা বিশ্বাস করছেন না। জরিপে দেখা যাচ্ছে, অনেকে তাকে বয়সে বেশি, বিচারে দুর্বল এবং আচরণে অস্থির মনে করছেন।
এ পরিস্থিতিতে ভ্যান্স চাইলে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, একজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে। তার সামনে অনেক কারণ রয়েছে ট্রাম্প থেকে দূরত্ব তৈরি করার। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় ভ্যান্স নিজেও প্রমাণ করেছেন যে, তিনি এখনো শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। জনসমক্ষে তাকে দুর্বল, অজ্ঞ, রাগী এবং সহজে প্রভাবিত হওয়ার মতো মনে হয়েছে।
একজন ক্যাথলিক হিসেবে ভ্যান্স ক্ষমা ও সংশোধনের ধারণায় বিশ্বাস করেন। ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে যদি তিনি নেতৃত্বগুণ অর্জন করতে পারেন, নম্রতা ও সংযম শিখতে পারেন এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেন, তাহলে তার পক্ষে নতুনভাবে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তার সামনে সময় আছে। তবে এর জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি