বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসে কঠোর শাস্তির বিধান

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার

দীর্ঘদিনের প্রশ্নপত্র ফাঁস, নকল ও জালিয়াতির দুষ্টচক্র ভাঙতে অবশেষে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার বিস্তার যখন পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তখন সময়োপযোগী ও কঠোর আইনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন আইনে যেমন বাড়ছে শাস্তির মাত্রা, তেমনি যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল অপরাধ দমনের আধুনিক কাঠামো। পাবলিক পরীক্ষা আইনের আওতায় আসবে নিয়োগসহ সব ধরনের অংশগ্রহণমূলক পরীক্ষা।

এ বিষয়ে শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা, জালিয়াতি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা বন্ধের লক্স্যে বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরনো আইনের দুর্বলতার সুযোগে অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে পার পেয়ে যাওয়ায় কঠোর আইন এখন সময়ের দাবি।

জানা গেছে, নতুন ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়ায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্ন ছড়ানো, গোপন তথ্য পাচার এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকলের মতো অপরাধগুলোও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুনর্গঠিত এই আইন গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরপর এটি সংসদে উত্থাপন করে চলতি অধিবেশনেই পাস করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নতুন আইন প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদ বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। নতুন আইনটি যদি প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বড় পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, ‘শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে অনেক মামলায় দণ্ড না হওয়ার মূল কারণ ছিল দুর্বল তদন্ত ও প্রমাণের অভাব।’

জানা গেছে, ১৯৮০ সালের আইন এবং ১৯৯২ সালের এর আংশিক সংশোধন বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের দাবি ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে নতুন ধরনের অপরাধ সৃষ্টি হলেও পুরনো আইনে সেগুলোর যথাযথ প্রতিকার ছিল না।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০০টি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৫টি, আর দণ্ড হয়েছে মাত্র একটিতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তের দুর্বলতা, ভুল আইনে মামলা ও সাক্ষ্য প্রমাণের ঘাটতির কারণে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এখন নকল ও প্রশ্নফাঁসের ধরন বদলে গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে এসব অপরাধ বেশি হচ্ছে। তাই নতুন আইনে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনে কী থাকছে : নতুন আইনের খসড়ায় বিভিন্ন অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ অন্যের হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিতরণে কঠোর শাস্তি। এ ছাড়া পরীক্ষাসংক্রান্ত নথি জালিয়াতি, নকলের সহায়তা করলেও শাস্তির বিধান থাকছে। নকলে জড়িত থাকলে শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও শাস্তির আওতায় আসবেন। এ ছাড়া বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, দ্রুত বিচার এবং ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে আইনের খসড়ায়।

ডিজিটাল অপরাধ দমনে গুরুত্বারোপ : নতুন আইনে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সংঘবদ্ধ চক্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের বিধান রাখা হয়েছে।

পরীক্ষাকেন্দ্রে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ : পরীক্ষার হলকে আরও নিরাপদ রাখতে প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে খসড়ায়।

এমনকি, আসন্ন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে ইতোমধ্যে কেন্দ্র সচিবদের জন্য ৩১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পরীক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর এই উদ্যোগের সঙ্গে নতুন আইন যুক্ত হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন আইনের কঠোরতা ও আধুনিক কাঠামো বাস্তবায়িত হলে বহুদিনের প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের চক্র ভাঙার সুযোগ তৈরি হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ