মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৫ অপরাহ্ন

যুদ্ধের ভেতরে রাষ্ট্র, জাতি ও প্রতিরোধের বাস্তবতা

বেহরুজ ঘামারি তাবরিজি
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৩ বার

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধ শুরু করে, তখন তারা ইরানের জনগণকে বিদ্রোহে নামার আহ্বান জানায়। এরপর তারা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বেসামরিক বাসস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাতেও হামলা চালায়।

বর্তমান বিস্ফোরণের শব্দ অনেক ইরানির কাছে অতীতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, বিশেষ করে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের কথা। ১৯৮০ সালের শরতে যখন ইরাক ইরানে আক্রমণ চালায়, তখন আমি তেহরান পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছর বয়সী একজন ছাত্র এবং একটি বিরোধী সংগঠনের সদস্য ছিলাম।

প্রথমবার আমি যুদ্ধের প্রভাব কাছ থেকে দেখি সেই বছরের অক্টোবর মাসে। এক সন্ধ্যায় আমি ও আমার বন্ধু ফারহাদ ইসফাহানগামী একটি বাসে সরকারবিরোধী লিফলেটের দুটি বাক্স তুলে দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং বিপ্লবী গার্ডের চেকপোস্ট থাকায় এটিই ছিল নিরাপদ উপায়।

হঠাৎ একটি ইরাকি যুদ্ধবিমান খুব নিচু দিয়ে উড়ে এলো, এতটাই নিচু যে আমরা পাইলটকেও দেখতে পাচ্ছিলাম। মানুষ আতঙ্কে দৌড়াতে শুরু করল। তারপর বিমানটি ঘুরে এসে আমাদের ওপর ফারসি ভাষায় লেখা লিফলেট ফেলল, যেখানে ইরানিদের নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বলা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, এটাই যুদ্ধ থামানোর একমাত্র উপায়, নিজেদের সরকারকে সরিয়ে দাও।

আমরা তখনই বুঝেছিলাম, সাদ্দাম হোসেন আমাদের সংগ্রামকে ব্যবহার করতে চাইছে। আমরা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি যে, ইরাকি বাহিনী আমাদের মুক্তিদাতা হতে পারে।

সে সময় বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছিল। আমরা কি দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণের সময় প্রতিরোধে অংশ নেব, নাকি এ সুযোগে নিজেদের সরকারবিরোধী আন্দোলন এগিয়ে নেব। আমি দ্বিতীয় মতের পক্ষে ছিলাম, অর্থাৎ যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে উৎখাত করার চিন্তায় ছিলাম।

তখনকার সরকার মাত্র এক বছরের পুরোনো হলেও জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছিল। এ ধারণা যে, শহরে বোমা হামলা বন্ধ করতে হলে জনগণকে সরকার উৎখাত করতে হবে, তা ছিল পুরোপুরি অবাস্তব। সাদ্দাম হোসেন খুব দ্রুতই বুঝে যায় যে, বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র লাখ লাখ মানুষকে সংগঠিত করে দেশ রক্ষা করতে পারে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।

আমরাও দ্রুত সেই শিক্ষা পেয়েছিলাম। সরকার শুধু আক্রমণ প্রতিহত করেই থামেনি, বিরোধীদের দমন করে নিজেদের ক্ষমতা আরও সুসংহত করেছে। হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়, অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় এবং বহু মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এমনকি যারা যুদ্ধের পক্ষে ছিল; কিন্তু সরকারের সমালোচনা করত, তাদেরও দমন করা হয়।

এখন ৪৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতারা একই ধরনের ধারণা পোষণ করছেন। পার্থক্য হলো, এবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু স্থলযুদ্ধ ছাড়াই শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। এ ধরনের যুদ্ধ আরও অনিশ্চয়তা ও ভয়ের জন্ম দেয়। যে কেউ, যে কোনো সময় লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আকাশপথের যুদ্ধ অনেক বেশি নির্বিচার হতে পারে।

আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, এ যুদ্ধ শুরুর সময় ইসলামী প্রজাতন্ত্র তার আগের মতো জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে এবং অর্থনীতি দুর্নীতিতে জর্জরিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিন্নমত দমনের কঠোরতা, যা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে গভীর দূরত্ব তৈরি করেছে।

হঠাৎ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গর্জন চারপাশ কাঁপিয়ে দেয় এবং আকাশ নীল, কমলা, হলুদ ও লাল আলোয় ভরে ওঠে। সাইরেন বেজে ওঠে। জীবনে এত ভয়, অসহায়ত্ব ও বিভ্রান্তি আমি আগে অনুভব করিনি। আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াতে দৌড়াতে, পায়ের নিচে কাঁপতে থাকা মাটি, অবিরাম বিস্ফোরণের শব্দ আর আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার আমাকে বুঝতেই দিচ্ছিল না আসলে কী ঘটছে।

বিমান প্রতিরক্ষা থেমে গেলে আমি ও ফারহাদ তার মোটরসাইকেলে করে আমাদের এলাকায় ফিরে যাই। আমার মা তখন নিশ্চিত ছিলেন আমি মারা গেছি।

কয়েক সপ্তাহ পর আবার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়। আমি আরেক বন্ধুর সঙ্গে তেহরানের একটি পার্কে বসে আলোচনা করছিলাম, কীভাবে একদিকে যুদ্ধের প্রতিবাদ করা যায়, আর অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালানো যায়।

তবে এর মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ আগ্রাসন সহজেই ইরানের সরকারকে পতন ঘটাতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসন এ বাস্তবতা ভুলভাবে বুঝেছিল এবং ইসরায়েলের পরিকল্পনায় বিশ্বাস করেছিল যে, এ যুদ্ধ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতন দ্রুত ঘটাবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল দুটি দিক থেকে। প্রথমত, তারা ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো বুঝতে পারেনি। বাহ্যিকভাবে যেমন দেখা যায়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কেবল একজন নেতার স্বৈরাচারী শাসনের ওপর নির্ভরশীল কোনো ব্যবস্থা নয়।

সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের ক্ষমতা অনেক বেশি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে পুরো রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে। ওয়াশিংটনের বিশ্লেষকরা বুঝতে পারেননি যে, ইরানে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো মিলেই পুরো রাষ্ট্রকে ধরে রাখে। এখন পরিষ্কার হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করলেও এ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত না। এটি একটি যুদ্ধাপরাধ হতো, যার কোনো বাস্তব ফল থাকত না।

দ্বিতীয়ত, তারা বুঝতে পারেনি যে, আকাশপথে নির্বিচার হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ চালালে রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়। খুব দ্রুতই অনেক ইরানি বুঝে গেছে যে, এ যুদ্ধ তাদের নিজস্ব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি মূলত দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারণা চেষ্টা করেছে এ যুদ্ধের দায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও তার আঞ্চলিক নীতির ওপর চাপাতে। কিন্তু রাষ্ট্রের ভুলের জন্য পুরো জাতিকে শাস্তি দেওয়ার এ অবস্থানের বিরুদ্ধে দেশের অধিকাংশ মানুষ দৃঢ় থেকেছে।

আশির দশকে সাদ্দাম হোসেন যেমন দাবি করেছিলেন, এখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুও বলছেন তারা ইরানিদের জন্য সরকার উৎখাতের পথ তৈরি করছেন। আর তা না করায় শহরে নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করে তারা পুরো জাতিকে শাস্তি দিচ্ছেন। মানুষের ওপর বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও হত্যার মাধ্যমে কষ্ট চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে নিজের সরকার উৎখাতে বাধ্য করার এ পুরোনো ধারণা যে কতটা নিষ্ঠুর, তা স্পষ্ট। এটি সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রে কাজ করেনি, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও কাজ করবে না।

১৯৮০ সালে বাস টার্মিনালে আতঙ্কে দৌড়ানো মানুষদের সঙ্গে আজ যারা বোমা হামলায় জীবন হারাচ্ছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা তাদের জীবনের ধ্বংস এবং প্রিয়জনদের হত্যার জন্য সেই শক্তিকেই দায়ী করে, যারা বোমা ফেলে।

এই বোমা কোনো জাতিকে মুক্ত করে না, বরং এর তাৎক্ষণিক ফল হয় রাষ্ট্রের আরও সামরিকীকরণ এবং নাগরিক সমাজের অবশিষ্ট অংশের ভেঙে পড়া। ইসলামী প্রজাতন্ত্র বহু আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা তারা ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ থেকে শিখেছে। কিন্তু এই ধরনের যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র সাধারণত নিজেদের ক্ষমতা আরও শক্ত করে এবং দমননীতি আরও জোরদার করে।

এ যুদ্ধ ভুল ধারণা দিয়ে শুরু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে চলছে। ১৯৮০ সালের ইরাকের আগ্রাসনের মতোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর নীতি লঙ্ঘন করেছে। তারা রাজনৈতিক নেতাদের হত্যার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে এবং এখন ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে, যা স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ হবে। এ যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে এবং কে জিতবে বা হারবে—তা এখনই বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এ যুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থা আর আগের মতো থাকবে না।

লেখক: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। বর্তমানে তিনি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের গ্র্যাজুয়েট সেন্টারের প্লেস, কালচার অ্যান্ড পলিটিক্স সেন্টারের ফেলো। তার সর্বশেষ বই দ্য লং ওয়ার অন ইরান: নিউ ইভেন্টস, ওল্ড কোয়েশ্চন জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ