সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

বিচার বিভাগ সংস্কার উদ্যোগ ঝুলে গেছে

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার

বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিতের পথে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংস্কারমূলক উদ্যোগ আপাতত আইনে রূপ পাচ্ছে না। এর ফলে নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান আবার আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেই থেকে যাচ্ছে এবং উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।

সংবিধান ও বহুল আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যকরভাবে পৃথক করার যে দীর্ঘদিনের দাবি, এই সিদ্ধান্তে তা আরও পিছিয়ে গেল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। যদিও ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও ‘রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা রূপরেখা’য় সুপ্রিমকোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ বিচারক নিয়োগ আইনের প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সরকার বলছে, অধ্যাদেশগুলোর ত্রুটি সংশোধন করে বিল আকারে আনা হবে; তবে ততদিন পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিমকোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই দুই অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। ফলে অধ্যাদেশগুলো আপাতত আইনে পরিণত হচ্ছে না। যদিও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ‘রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা রূপরেখা’য়ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও বিচারক নিয়োগ আইন প্রণয়নের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

আইনজ্ঞরা বলছেন, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিমকোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল হলে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আগের মতোই চলে যাবে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। আর উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর হাতে চলে যাচ্ছে। কারণ রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া এই নিয়োগ সম্পন্ন হবে না। এর ফলে ২৭ বছর আগে আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের প্রকৃত উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হচ্ছে।

রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখার নবম দফায় বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে। অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত হবে (সংবিধানের ভাষা)। বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে।

এ ছাড়া এই দফায় আরও বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন প্রশ্নে সংবিধানে বর্ণিত এর আগে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হবে। এজন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করিয়া বিচারক নিয়োগ করা হবে। সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৫(গ) অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড সংবলিত ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করা হবে।

এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারেও সুপ্রিমকোর্টের আলাদা সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সংসদে এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। তবে তিনি তা সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শক্রমে করবেন। অধ্যাদেশে রাষ্ট্রপতির পক্ষে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ও বিচারিক সার্ভিসের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়কে দেওয়া হয়, যা আগে আইন মন্ত্রণালয় করত। অধ্যাদেশ রহিত হলে আবার আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে এই ক্ষমতা ফিরবে।

অধ্যাদেশে সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ায় হয়েছে। অধ্যাদেশটি রহিতে সংসদের বিশেষ কমিটিকে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। সরকারের সঙ্গে কাজের সমন্বয় হবে না। একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরের মাসে সচিবালয়ের উদ্বোধনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছিলেন, আগামী দিনে যে নির্বাচিত সরকার আসবে, তাদের তো বটেই এবং যত অংশীজন আছে, তাদের সবাইকে এই ধারাবাহিকতা, এই সচিবালয়ের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন বজায় রাখা, গণতন্ত্রকে বজায় রাখাÑ এই ধারাবাহিকতা যেন অটল থাকে, অটুট থাকে।

এরপর ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। এরই মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের পৃথক সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব, ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার এবং ১৯ জন স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। অধ্যাদেশ রহিত হলে এসব কার্যক্রমের বিষয়েও কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্টের দুজন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত সাবেক একজন বিচারপতি ও একজন অধ্যাপককে নিয়ে গঠিত কাউন্সিল পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারপতি পদে নিয়োগে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করবে। তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়োগের নাম পাঠাবে। এই প্রস্তাব প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে। অধ্যাদেশ রহিতের সিদ্ধান্তে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা ফের সরকারের হাতে যাচ্ছে।

তবে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আমাদের সময়কে বলেন, অধ্যাদেশগুলো আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করেছি, আমরা দেখেছিÑ অধ্যাদেশ যথাযথভাবে হয়নি। সংবিধানের বাইরে গিয়ে অধ্যাদেশ করা যায় না। সংবিধানে যা পারমিট করে না, ধরেন বিচারক নিয়োগে অধ্যাদেশে বলা হচ্ছে ৪৫ বছর। এটা তো সংবিধানে নেই। কী কী ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে বিচারক নিয়োগ হবে তা সংবিধানে বলা আছে। সংবিধানে যতক্ষণ পর্যন্ত এসব জিনিস না আসবে, সংশোধন করে এগুলো না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অধ্যাদেশ আমরা গ্রহণ করতে পারি না।

পৃথক সচিবালয়ে ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা সুপ্রিমকোর্টে পৃথক সচিবালয় চাই। এটা আমাদের ৩১ দফার মধ্যে এবং নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে। এ বিষয়ে সংসদে বিল আকারে আসবে, এবং তা সংবিধানের অংশ হবে। তখনই পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হবে।

অধ্যাদেশ দুটি রহিতকরণের সুপারিশের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আমাদের সময়কে বলেন, এই আইন না থাকলে বিচার বিভাগের নিম্ন আদালতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ কারণেই হাইকোর্টের রায়ের আলোকে আমরা বলছিলাম যে, সুপ্রিমকোর্টের আলাদা সচিবালয় আসতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ দিকে এই অধ্যাদেশ করে গেছে। জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখন আইন প্রণয়নের দায়িত্বে। কী কারণে এই অধ্যাদেশগুলো পাস হচ্ছে না, মিডিয়ায় আসছে তারা এগুলো সংসদে বিল আকারে আনবে। এটাও হতে পারে এই অধ্যাদেশের ফাউন্ডেশনটা তারা যেভাবে চাচ্ছে সেভাবে নেই। আবার হতে পারেÑ এত বড় কাজের স্বীকৃতি ড. ইউনূসকে কেন দেবে। তিনি বলেন, সরকার যেহেতু বলছে- এগুলো বিল আকারে আনবে, এখন আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে যে, বিএনপির পক্ষ থেকে কী করা হয়। সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি, তিনি আইনজীবী। সচিবালয় আনার ব্যাপারে তিনি আগে বারবার বলেছেন। এখন কেন করা হচ্ছে না, উনাদের চিন্তাচেতনার পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। কোনো রাজনৈতিক কারণ কিছু একটা আছে, যা আমরা জানি না। আমার কথা হলো, বিল আকারে এনে হলেও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগ আইন নিশ্চিত করা হোক। যদি না করা হয় তাহলে বিচার বিভাগের জন্য সুখকর হবে না, এবং জনগণও তখন সরকারকে অন্যদৃষ্টিতে দেখবে।

সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক দুটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশে ক্ষুব্ধ ও হতাশা ব্যক্ত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

গত শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, এই কী তার নমুনা? নাকি পরিস্থিতি বিবেচনা করে জনরায়কে প্রভাবিত করার অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন দল ‘শুধু কথার কথা’ হিসেবেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অঙ্গীকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ কতটা কলুষিত ও বিরুদ্ধমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকার ভুলে গেল, যা খুবই হতাশাজনক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ