শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

ইরান যুদ্ধে নৈতিক পতন যুক্তরাষ্ট্রের

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে শুধু অস্ত্রের ঝনঝনানিই নয়, বরং মার্কিন মূল্যবোধেরও যেন মৃত্যু ঘটছে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে বেসামরিক ও অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন। তেহরানের সংযোগ সেতু থেকে শুরু করে শতাব্দী প্রাচীন চিকিৎসাকেন্দ্রÑ কোনো কিছুই তাদের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে শুধু রাজনৈতিকভাবেই সমালোচিত হচ্ছে তা নয়, বরং তাদের চরম ‘নৈতিক পতন’ বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে বলেছেন, ‘বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা, নির্মাণাধীন সেতুগুলোতে আক্রমণ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শত্রুর পরাজয় এবং নৈতিক পতনের বার্তা দেয়।’

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে নিজের পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেরহান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি, উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য

প্রত্যাঘাত করে যাচ্ছে। এতে শত্রুশিবির দিশাহীন; তাদের পূর্বপরিকল্পিত ছক ইরান যুদ্ধে কাজ করেনি। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে বেরুতে চাচ্ছেন, কিন্তু ‘জয় ঘোষণার মতো’ কোনো সরল পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। বরং নানা দিক থেকেই ঘরে ও বাইরে তাকে ব্যর্থ মার্কিন নেতার তকমা নিতে হচ্ছে।

তবে ট্রাম্প হুমকি-ধমকি দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরানে ধ্বংস করার মতো যা কিছু আছে, তা কেবল শুরু হয়েছে।’ বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক মাধ্যমে তিনি তেহরানের কাছে কারাজ শহরের একটি সদ্য নির্মিত সেতুর ধ্বংসাবশেষের ভিডিও প্রকাশ করে দম্ভভরে বলেন, ‘ইরানের সবচেয়ে বড় সেতুটি ধসে পড়েছে। এটি আর কখনোই ব্যবহার করা যাবে না। সামনে এমন আরও অনেক কিছুই আসছে!’ তবে এরপর তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সেতুর তালিকা প্রকাশ করে হুশিয়ারি দিয়েছে, এসব সেতু শিগগির লক্ষ্যবস্তু হবে।

বি-১ নামের ওই সেতুটি হামলায় অন্তত আটজন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। ইরানিরা যখন ‘প্রকৃতি দিবস’ উদ্?যাপন করছিল এবং অনেক পরিবার ওই এলাকায় সময় কাটাচ্ছিল, ঠিক তখনই এই ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মহামারী কলেরা ও কোভিড-১৯ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই প্রথম ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে ইরান এটিকে এফ-৩৫ বলে দাবি করলেও পরে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে, এটি যুক্তরাজ্যের মার্কিন ঘাঁটি থেকে আসা একটি এফ-১৫ই। পরে মার্কিন এক কর্মকর্তাও এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো ভূপাতিত বিমানের লেজ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছে। পাইলটদের জীবিত উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে একটি কমব্যাট হেলিকপ্টার দল পাঠালেও ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সেই উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারটিও ভূপাতিত করেছে তারা। এমনকি একজন পাইলটকে আটক করার দাবিও করেছে তেহরান।

মার্কিন আগ্রাসনের মোক্ষম জবাব দিতে ইরান ও তাদের মিত্ররা আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদেশগুলোতে হামলা জোরদার করেছে। শুক্রবার সকালে কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগার এবং ‘মিনা আল-আহমাদি’ তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান, যার ফলে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা সাইরেন বেজেছে। আবুধাবিতে গ্যাস স্থাপনাগুলোর ওপর বাধা দেওয়া ড্রোন বা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ এসে পড়েছে। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত একজন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, ইরানের সামরিক শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা লাগাতার বোমাবর্ষণের পরও ইরানের অন্তত অর্ধেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনও সম্পূর্ণ অক্ষত ও কার্যকর রয়েছে। গোয়েন্দাদের মতে, এগুলো মাটির এত গভীরে লুক্কায়িত যে, মার্কিন হামলা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, হাজার হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ মিসাইলও ইরানের হাতে মজুদ আছে। এর অর্থ হলো, তেহরান এখনো চাইলে পুরো অঞ্চলে ‘চরম ধ্বংসযজ্ঞ’ চালানোর মতো সামরিক সক্ষমতা রাখে।

এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই শান্তির একটি রূপরেখা হাজির করেছেন ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সে লেখা এক নিবন্ধে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ইরানের উচিত এখনই বিজয় ঘোষণা করে এমন একটি চুক্তিতে আসা, যা এই যুদ্ধ শেষ করবে। তার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরান আর কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না এবং তাদের মজুদ ইউরেনিয়ামের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর সেখানে তেহরানকেও চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। মস্কোর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংঘাত এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যেকোনো ধরনের সাহায্য করতে তারা প্রস্তুত। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘আমরা সবাই আশা করি চলমান এই সংকটের দ্রুত সমাধান হবে এবং সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।’

ক্ষমতা, দম্ভ আর ধ্বংসের এই খেলায় ট্রাম্প প্রশাসন কি সত্যিই শান্তির পথে হাঁটবে, নাকি নিজের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে আরও রক্তপাতের পথ বেছে নেবে?

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ