যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটিতে যে গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো এই আঘাত ইরানকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্টের এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে এই সংঘাতকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অহংকার ও নেতানিয়াহুর আধিপত্য বিস্তারের অন্ধ স্বপ্নের চরম পরিণতি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই ব্যক্তি’ বলা হয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খামেনিকে হত্যার পর ট্রাম্পের ধারণা ছিল ইরানিরা বিদ্রোহ করবে। কিন্তু বাস্তবে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে শোক জানিয়েছে ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নিয়েছে। খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন
তার ছেলে মোজতবা খামেনি। মোজতবার সঙ্গে ইরানের শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য নিষেধ সত্ত্বেও মোজতবাকে বেছে নিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো হুমকিতেই মাথানত করবে না।
যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বকে ১৯৭৩ সালের চেয়েও বড় এক জ্বালানি সংকটের মুখে ফেলেছে।
শুধু তাই নয়, কাতারভিত্তিক ১১০ কোটি ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক মার্কিন রাডার ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ইরান। বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্যাট্রিয়ট সিস্টেম এনে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে। রিয়াদ, দোহা থেকে শুরু করে দুবাই পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এরই মধ্যে এই যুদ্ধে সাইপ্রাস, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ অন্তত ১৪টি দেশ জড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর ইরানের কট্টর সমালোচকরাও দেশের স্বার্থে একাট্টা হয়েছেন। নির্বাসিত ইরানি দার্শনিক ও সরকারের সমালোচক আবদুল করিম সোরোশও দেশবাসীকে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং সামরিক বাহিনীকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সামনে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ওয়াল স্ট্রিটের চরম অস্থিরতাও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দ্রুত পরাস্ত করার কোনো লক্ষণ এই মুহূর্তে নেই; বরং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর জেদের কারণে হাজারো নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।