বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ন

অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশিদের কাছে শুধু দূরবর্তী খবর নয়, তার কালো ছায়া পড়েছে সরাসরি জীবন ও জীবিকার ওপর। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাতের কারণে এখন বাংলাদেশি শ্রমিকরা দ্বন্দ্বের ‘সীমানা’ অনুভব করছেন। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে লাখ লাখ বাংলাদেশি ঘর-পরিবারের অর্থ উপার্জন করছেন।

তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, ততই ভয়-শঙ্কা ভর করছে অভিবাসী শ্রমিকদের মনে। বিমান চলাচল বন্ধ বা বাতিল হচ্ছে, চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, আর রেমিট্যান্সের প্রবাহও হুমকির মুখে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো দেশে কর্মরত শ্রমিকরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। যেসব শ্রমিক নতুনভাবে বিদেশে যাচ্ছেন, তারা ভিসা ও যাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আবার যারা সেখানে ইতোমধ্যে কর্মরত, তাদের নিরাপত্তা ও চাকরি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শুধু চাকরিই নয়, রেমিট্যান্স, অর্থনীতি এবং বাংলাদেশি পরিবারের জীবনমানও হুমকির মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই বিমানবন্দরগুলোয় ফ্লাইট বাতিল, ভিসার মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারার মতো ঘটনা ঘটছে। এসব সংকট প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কেবল একটি বিদেশি সংঘাত নয়Ñ এটি বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন ও দেশের অর্থনীতির জন্য সরাসরি একটি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট সোয়া কোটি অভিবাসীর মধ্যে অন্তত ৬০-৬৫ লাখের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। আবার কোনো কোনো সূত্রে বাংলাদেশের মোট অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি বলে উল্লেখ করা হয়। এই বিশাল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইনে কর্মরত। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব, যেখানে মোট বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ কাজ পান। সৌদির পরেই রয়েছে কাতারের নাম। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজের সন্ধানে যান।

মধ্যপ্রাচ্য শুধু শ্রমবাজার হিসেবেই নয়, রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে প্রায় ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে প্রায় ৩৮৮ মিলিয়ন ডলার, যা তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্দান ও ইরাক থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব দেশের বাইরে থেকেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ হুন্ডি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করে।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পুরো ব্যবস্থাটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব দেশের অনেকগুলোতেই বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তাদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান

দুই দিক থেকেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইতোমধ্যে সংঘাতের প্রভাব সরাসরি দেখা গেছে বিমান চলাচলে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, সংঘাতের প্রথম তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ১০২টি ও এক সপ্তাহে ২৪৫টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও বাতিল হয়েছে অন্তত ২৪টি ফ্লাইট। এর ফলে হাজারো যাত্রী, বিশেষ করে কর্মস্থলে যোগ দিতে যাওয়া শ্রমিকরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক শ্রমিক নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। অনেকের ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আবার ছুটি শেষে দেশে থেকে কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল এমন বহু শ্রমিক বিমানবন্দরে গিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ কয়েকদিন ধরে ফ্লাইটের অপেক্ষায় থেকেও যেতে পারেননি।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে একজন করে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দিলে প্রথম ধাক্কা লাগে অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে। অথচ এই খাতগুলোতেই সবচেয়ে বেশি কাজ করেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক প্রকল্প স্থগিত হতে পারে এবং নতুন নিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে বর্তমান শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি নতুন শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার সুযোগও কমে যেতে পারে।

শ্রম ও অভিবাসন বিশ্লেষক রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) মেরিনা সুলতানা বলেন, এই পরিস্থিতির প্রভাব দুইভাবে দেখা দিতে পারে। একদিকে যারা নতুন করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে যারা ইতোমধ্যে সেখানে কর্মরত, তাদের চাকরি ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে নতুন শ্রমবাজার খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহেও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংকাররাও। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ব্যাহত হলে তা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব কতটা হবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।

সরকারি পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো শ্রমিক যদি সমস্যায় পড়েন, তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য সহায়তা এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, যেসব শ্রমিক ফ্লাইট বাতিল বা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আটকে পড়েছেন, তাদের ভিসা বা ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

প্রবাসীদের সহায়তার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল থেকে রাজধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ভবনে এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার জারিকৃত এক অফিস আদেশের আলোকে ১০ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি চালু থাকবে। এ সময় তিনটি শিফটে মোট ২১ জন কর্মকর্তা ও ৪২ জন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন।

ঢাকার ইস্কাটনে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ভবনে প্রবাসী কল সেন্টারে স্থাপিত এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন ওয়েজ আর্নারস কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া। আর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান-১ শাখার উপসচিব মো. হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডল।

অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ছক অনুযায়ী প্রবাসীদের পরিস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে তা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেবেন।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘিরে প্রবাসীদের যে কোনো জরুরি তথ্য সংগ্রহ, সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে এর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ