বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
পুলিশের ছয় শীর্ষ পদে রদবদল, এসবি প্রধান হলেন কামরুল আহসান ইউপি নির্বাচন : পাঁচ ধাপে ভোট চায় বিএনপি বিডিআর হত্যার ৪ প্রত্যক্ষদর্শীকে গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তায় বেঁধে নদীতে ফেলেন জিয়াউল আহসান সংসদের তিন অধিবেশনে খরচ ৭০৩ কোটি টাকা ভালো অর্জনকে স্বীকৃতি দেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্টের ২৫ বছরের কারাদণ্ড মানুষ যে ধরনের আইন চায়, সে ধরনের আইনই আনবে সরকার: আইনমন্ত্রী ‘ভারতে পলাতক ফ্যাসিবাদী ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যাতে অস্থিতিশীলতার চেষ্টা করতে না পারে’ নির্বাচনী এজেন্টের ব্যাংক হিসাব দাখিল বাধ্যতামূলক করল ইসি মেসির ১০০তম গোলে চ্যাম্পিয়ন মায়ামি

লুটের ২২ শতাংশ অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লুটের সব অস্ত্র এখনও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ফেরেনি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৭টি। এখনও হদিস মেলেনি ১ হাজার ৩০৬টির, যা মোট লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ২২ শতাংশ।

উদ্ধারের বাইরে থাকা এসব অস্ত্র এখন শুধু পুলিশের হারানো সম্পদ নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি অস্ত্রের তদন্তে প্রমাণ মিলেছে, থানা থেকে লুট হওয়ার পর সেগুলো একাধিকবার হাতবদল হয়ে পৌঁছেছে সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের হাতে। এসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, দখল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে। সামনে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে বেহাত অস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিরাপত্তা

বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি শুধু পুলিশের হারানো সম্পদ উদ্ধারের প্রশ্ন নয়। এটি এখন সরাসরি আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ ইতোমধ্যে প্রমাণ পাওয়া গেছে— লুটের কিছু অস্ত্র অপরাধীদের হাতে গিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের ওপর গুলি চালানোর মতো ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে নিখোঁজ প্রতিটি অস্ত্র সম্ভাব্য একটি অপরাধের উপকরণ। তিনি বলেন, সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ৫ আগস্টের লুটের ঘটনার ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না, বরং সময় যত যাচ্ছে, অস্ত্রগুলো যত বেশি হাতবদল হচ্ছে, সেগুলোর উৎস শনাক্ত এবং কোথায় ব্যবহার হয়েছে তার হিসাব বের করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সামনে স্থানীয় নির্বাচন। লুটের অস্ত্র উদ্ধারের বাইরে থাকলে তা স্থানীয় নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার, ভোটকেন্দ্রে দখলসহ আরও নানা অপরাধে ব্যবহার হতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, ‘লুন্ঠিত অস্ত্রের একটা বড় অংশই উদ্ধার হয়েছে। এখনও যেসব অস্ত্র উদ্ধারের বাইরে রয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। কারও কাছে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কোনো খবর থাকলে তা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্র। একই সময়ে লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৫টি। এখনও উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদ। অর্থাৎ লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রায় ২৩ শতাংশ এবং গোলাবারুদের প্রায় ৩৯ শতাংশ এখনও পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিখোঁজ অস্ত্রগুলোর মধ্যে ৯ মিমি পিস্তল ও ১২-বোর শটগানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। নিখোঁজ অস্ত্রের ঝুঁকি যে শুধু কাগজে-কলমে নয়, তার প্রমাণ মিলছে একের পর এক ঘটনায়।

সবশেষ আলোচিত ঘটনা চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’। গত ২৬ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তারের অভিযানে পুলিশের দিকে যে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়া হয়, সেটি পরীক্ষা করে পুলিশ নিশ্চিত হয় পিস্তলটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক জানিয়েছেন, অন্য এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে তিনি অস্ত্রটি পেয়েছিলেন। অর্থাৎ থানা থেকে লুট হওয়ার পর অস্ত্রটি একাধিক হাত ঘুরে অপরাধী নেটওয়ার্কে পৌঁছেছিল।

এর আগেও পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি র‌্যাবের এক অভিযানে মিরপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা একটি বিদেশি পিস্তলের বিষয়ে তদন্তে জানা যায়, সেটি ৫ আগস্টের পর একটি থানা থেকে লুট হয়েছিল। পরে কয়েক দফা হাতবদল হয়ে অস্ত্রটি মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

অর্থাৎ লুটের অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর তা তাদের জন্য সাধারণ অবৈধ অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। কারণ এগুলোর বেশির ভাগই ছিল পুলিশের ব্যবহৃত কার্যকর ও প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র।

৫ আগস্টের ঘটনার পরপরই লুট হওয়া অস্ত্র ফেরত দিতে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ বাহিনী অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। প্রথম দিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হলেও সময় যত গড়িয়েছে, উদ্ধারের গতি তত কমেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, সারা দেশে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

গত ২ মার্চ সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক পরিদর্শক মাদক সন্ত্রাসীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৮ জুন সায়েদাবাদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী অটো সজলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যে স্বামীবাগের একটি ভাড়া বাসা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন, ৭৭ রাউন্ড গুলি, ৫৯ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে। গ্রেপ্তারের পর অটো সজল পুলিশকে বলেছে, উদ্ধারকৃত অস্ত্র গুলি তারা ৫ আগস্ট ওয়ারী থানা থেকে লুট করেছিল।

এদিকে র?্যাব-১০ এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, গত ৩০ আগস্ট গেন্ডারিয়ায় মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘটিত গোলাগুলিতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার তদন্তে নেমে র‌্যাব অটো সজল গ্রুপের ৫ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের দখল থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন, ১২ রাউন্ড তাজা গুলি এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে একটি ম্যাগাজিন গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ স্টেশন থেকে লুণ্ঠিত হওয়া অস্ত্রের অংশ বলে শনাক্ত করেছে র?্যাব।

গত ৩ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জেলের জালে পুলিশের লুট হওয়া একটি শটগান উঠে আসে। পরে পুলিশ অস্ত্রটি উদ্ধার করে রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হয়েছে এটি ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি।

গত শনিবার দুপুরে আড়াইহাজার বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলার একটি তাক থেকে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা থেকে এই অস্ত্র লুট হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্রের কেনাবেচার তথ্যও পুলিশের তদন্তে উঠে আসছে। চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি বিদেশি পিস্তলসহ মিনহাজ উদ্দিন রাহিম (২১) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ডবলমুরিং থানায় ঢুকে একটি পিস্তল লুট করেন মিনহাজ। পরে আমির হোসেন নামে একজনের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। পরে তার দেওয়া তথ্যে গত ১৩ এপ্রিল মিনহাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় থানা ফাঁড়ির অস্ত্র ও গুলির বেশিরভাগই লুট করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং দলীয় ক্যাডাররা। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা যেসব অস্ত্র ও গুলি লুট করে তা কম দামে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপের কাছে বিক্রি করে। এসব অস্ত্র আবার হাতবদল হয়ে চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবার সেই অস্ত্র পুরান সহযোগীদের পাশাপাশি নতুন মুখের সন্ত্রাসীদের হাতেও তুলে দিয়েছে। যাতে নতুন মুখের সন্ত্রাসীদের পুলিশ ও র‌্যাব চিনতে না পারে। আর তা দিয়ে একের পর এক খুনোখুনি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চালাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া লুণ্ঠিত অস্ত্র ডাকাত, ছিনতাইকারী, অপহরণকারীচক্র, কিশোর গ্যাং, জলদস্যু, বনদস্যুদের হাতেও গেছে। বেহাত অস্ত্র দিয়েই তারা নানা অপরাধ করছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ