সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবার নেইবারহুড পুলিশিং

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ০ বার

দেশে কিশোর গ্যাং, মাদক চোরাকারবার ও চুরি-ছিনতাই রোধে সরকার নেইবারহুড পুলিশিং চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে খুব সহজে সমাজ থেকেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থায়ীভাবে নির্মূল করা সম্ভব হবে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থানায় না গিয়েই মিলবে পুলিশি সেবা, বরং নাগরিকদের সমস্যায় পুলিশই দরজায় এসে হাজির হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেইবারহুড পুলিশিং ধারণা চালু রয়েছে। এর মূল দর্শন পুলিশ একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করবে এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে সেই সমস্যা সমাধান করবে। যেখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুধু থানাকেন্দ্রিক হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেইবারহুড পুলিশিং সফল করতে হলে শুধু নতুন কমিটি বা নতুন পদবি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্দিষ্ট জনবল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, তথ্যভান্ডার, সময় ও জবাবদিহি। মানুষ পুলিশকে তথ্য দিতে ভয় পেলে পুরো ব্যবস্থাটি ব্যর্থ হবে। তথ্যদাতার পরিচয় ফাঁস হলে ভবিষ্যতে কেউ তথ্য দিতে চাইবে না। নেইবারহুড পুলিশিংয়ের সঙ্গে গোপনীয়তা ও তথ্যদাতার নিরাপত্তা বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন শাখা থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো বর্তমান সরকারের ছয় মাসে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ একটি প্রতিবেদনে নেইবারহুড পুলিশিংয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে এই ধারণা পুরোপুরি নতুন নয়। বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মধ্যেই নেইবারহুড পুলিশিংয়ের ধারণা আছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ২০১১ সালে বিট পুলিশিং চালু করে। বর্তমানে ৫০টি থানার এলাকায় ২৮৭টি বিট কার্যকর রয়েছে। প্রতিটি থানাকে তিন থেকে ১০টি বিটে ভাগ করে প্রতিটি বিটে একজন এসআই ও একজন এএসআই দায়িত্ব পালন করেন; একজন পরিদর্শক বিট কার্যক্রম তদারক করেন। প্রতিটি বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সরকারি মোবাইল নম্বরও নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রমনা ও চকবাজার থানাসহ একাধিক থানার বিট নম্বরে ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সব নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে একটি থানার ওসিকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে বিট পুলিশিং কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আছে। এখন আর বিটে কোনো পুলিশকে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের।

প্রচলিত পুলিশিংয়ে সাধারণত ঘটনা ঘটে, থানায় অভিযোগ যায়, এরপর পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু নেইবারহুড পুলিশিংয়ের দর্শন ভিন্ন। এখানে নাগরিক থানায় এসে অভিযোগ করার জন্য পুলিশ অপেক্ষা করবে না। একটি নির্দিষ্ট মহল্লার জন্য নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা থাকবেন। তিনি এলাকার মানুষকে চিনবেন, সমস্যাগুলো জানবেন, অপরাধের ধরন সম্পর্কে ধারণা রাখবেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করবেন। কোন এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়েছে, কোথায় অপরাধ মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেটা তার কাছে পরিষ্কার থাকবে। প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রতিটি ঘটনা আলাদা মামলা হিসেবে তদন্ত হতে পারে। নেইবারহুড পুলিশিংয়ে প্রশ্নটি হবে আরও আগে চুরিগুলো কোথায় হচ্ছে, কোন সময়ে হচ্ছে, একই ধরনের বস্তু টার্গেট করা হচ্ছে কি না, সিসিটিভি কোথায় আছে, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয়দের কোনো তথ্য আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনা ঘটার আগেই পুলিশ, সেটা স্থানীয়দের নিয়ে সমাধান করবেন।

অপরাধের আগেই প্রতিরোধ : পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিট পুলিশিংয়ের উদ্দেশ্য হলো পুলিশ-জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা, অপরাধের ভয় কমানো এবং একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্বশীল করা। উভয় পক্ষের সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধভীতি ও পুলিশভীতি কমানো। কিন্তু বিট পুলিশিং চালুর প্রায় দেড় দশক পরও এটা কতটা কার্যকর হয়েছে তার উত্তর খুব পরিষ্কার নয়।

সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকা মহানগরের বিট পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণাটি চারটি থানার ১৫৩ জন সাধারণ নাগরিক ও ১৬২ জন পুলিশ সদস্যের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা। সেখানে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা অন্তত নিজের বিট নম্বর জানেন। ৬৩ শতাংশ মনে করেন, বিট পুলিশিং চালুর পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে অনেক নাগরিকের বিট পুলিশিং সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই এবং প্রচারের ঘাটতি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওই গবেষণায় বলা হয়, ডিএমপির বিট পুলিশিং কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর পেছনে জনবল ও লজিস্টিক ঘাটতি, পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব, আর্থিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং প্রচারের দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিট পুলিশ সদস্যরা এসব সংকটের পাশাপাশি কাজের চাপ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের কথা জানিয়েছেন। তাদের একটি অংশ বিট পুলিশিংয়ের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা বা ভাতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

নাগরিকের তথ্যই হবে বড় শক্তি : নেইবারহুড পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে স্থানীয়দের তথ্য। একজন দোকানি জানেন, কোন গলিতে অপরিচিত লোক ঘোরাফেরা করছে। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী জানেন, কখন সন্দেহজনক ব্যক্তিরা আসে। স্কুলশিক্ষক জানেন, কোন শিক্ষার্থী হঠাৎ মাদকাসক্তির দিকে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানেন, কোন জায়গাটি সন্ধ্যার পর ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো পুলিশ যদি নিয়মিত সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে একটি এলাকার ক্রাইম ম্যাপ তৈরি করা সম্ভব। যদি প্রতিটি মহল্লার জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, স্থানীয় অপরাধের ডাটাবেজ, বাসিন্দাদের নিয়মিত সভা, সমস্যা শনাক্তকরণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, তথ্যদাতার নিরাপত্তা এবং কর্মকর্তার কর্মদক্ষতার পরিমাপ চালু করা যায় তাহলে এটি সত্যিই পুলিশের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের কাঠামো বদলে দিতে পারে। তবে নেইবারহুড পুলিশিংয়ের জন্য শুধু মানসিকতা নয়, আলাদা সময় ও জনবল প্রয়োজন। অন্যথায় একজন বিট কর্মকর্তা কাগজে মহল্লার দায়িত্বে থাকবেন, বাস্তবে থাকবেন থানার নানা কাজে।

বিশেষজ্ঞ মতামত : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেইবারহুড পুলিশিংয়ের দরকার আছে, কিন্তু সেটা তো পলিটিসাইজেশন (রাজনীতিয়ান) হবে, চ্যালেঞ্জটা তো ওখানেই। ফিলোসফিক্যালি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু ওটা যদি যেতে হয়, তাহলে শুধু নাম আর স্ট্রাকচার তো আগের মতোই থেকে যাবে। কমিউনিটির মধ্যে যারা নেইবারহুড পুলিশিংয়ে আসবে তখন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজনকে, শিক্ষক বা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের টেনে আনা হবে। কমিউনিটি পুলিশিং যেটা ছিল, সেটা ব্যর্থ হয়েছে; আর নেইবারহুড পুলিশিং তো একই জিনিসের একটি প্রতিশব্দ বা সিনোনিম।

তিনি বলেন, বিদেশে দেখেছি পুলিশ কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্টের ক্ষেত্রে চেষ্টা করে যাতে প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে একটা পুলিশিং থাকে। আমরা বলি ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’, কিন্তু তারা এমন একটা সোসাইটি ক্রিয়েট করুক যাতে ওনারশিপ ডেভেলপ হয়। আমরা যখন সত্যিই বন্ধু হব, তখন কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্ট ও নেইবারহুড এঙ্গেজমেন্ট বাড়বে। পুলিশকে ফ্রেন্ড ভাবলে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের অভিযোগ নিয়ে যেতে পারবে, তাদের কথা শোনা হবে এবং তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেওয়া যাবে।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শুধু নতুন শব্দ বা নাম ব্যবহার করে রুল অব ল তৈরি করা যাবে না। রেস্টোরেটিভ জাস্টিস অ্যাপ্রোচ দিয়ে এগোলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। থানায় দলমত-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, ভুক্তভোগী ও অফেন্ডারকে নিয়ে সমাবেশ হবে এবং মার্ডার ও রেপ ছাড়া বাকি মামলাগুলো সেখানেই মীমাংসা হয়ে যাবে, কোর্টে যাওয়া লাগবে না।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিট ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ধারণা থেকেই নেইবারহুড পুলিশিংয়ের কাজ চলছে। এতে অপরাধ ঘটনার আগেই সেটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এই পদ্ধিতিতে জাপানসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে চালু রয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষকে থানায় যেতে হয় না, পুলিশ মহল্লায় তাদের সেবা দেন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ