এএসডি বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার আক্রান্ত শিশুর ঘুমের প্রায়ই নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। এ দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ব্যাঘাত শিশু, বাবা-মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর গভীর ও বিরূপ প্রভাব ফেলে। সাধারণ শিশুর তুলনায় অটিজম শিশুর ভাষা, যোগাযোগ ও আচরণগত দিক থেকে আলাদা হয় এবং তাদের অতিরিক্ত যত্ন ও ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। এএসডি শিশুর ঘুমের সমস্যার মধ্যে রয়েছে সময়মতো ঘুম না আসা, দুঃস্বপ্নের কারণে ঘন ঘন জেগে ওঠা, বিছানায় প্রস্রাব করা, নাক ডাকা, অস্থিরতা এবং অপর্যাপ্ত ঘুমের সময়। এ সমস্যাগুলো কেবল শিশুর জীবনযাত্রার মান এবং দিনের বেলার কার্যকলাপকেই ব্যাহত করে না, বরং বাবা-মায়ের মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অটিস্টিক শিশুর ঘুমের সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জিনগত কারণ, যা শিশুর ঘুমানোর এবং সতেজ হয়ে ওঠার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাশাপাশি, মেলাটোনিনের ঘাটতি সার্কাডিয়ান রিদম বা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রকে ব্যাহত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মেলাটোনিন ব্যবহারে শিশুর ঘুমের ধরন, আচরণ এবং মা-বাবার মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ ছাড়া অটিজম শিশুর বাইরের উদ্দীপনা, যেমন— স্পর্শ, আলো বা শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা থাকে। এডিএইচডি, উদ্বেগ, মৃগীরোগ, গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল সমস্যা বা ব্যথার মতো কো-অকারিং কন্ডিশনগুলোও ঘুমের বড় অন্তরায়। অনেক শিশু ক্লান্তি অনুভব করলেও তা প্রকাশের ভাষা বা কৌশল জানে না।
খাদ্যাভ্যাস এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঘুমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। চিনি, রঞ্জক পদার্থ বা নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা আচরণ ও ঘুমকে প্রভাবিত করে। রুটিনের যেকোনো সামান্য পরিবর্তন তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। শিশুর ভালো ঘুমের জন্য পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়াম বা যোগাসনের অভ্যাস অত্যন্ত কার্যকরী। অনেক শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, যা তাদের নিরাপত্তা দেয়। তবে তাদের ধীরে ধীরে নিজস্ব বিছানায় ঘুমাতে অভ্যস্ত করা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের কাছে শিশুর ঘুমের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বিকাশগত দুর্বলতা, প্ররোচনাকারী কারণ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকগুলো বিবেচনা করতে হবে। ঘুমের একটি লগ বা ডায়েরি রাখা সমস্যার কারণ নির্ণয়ে সহায়ক হয়। ইতিবাচক ঘুমের অভ্যাস গড়তে টনসিলাইটিস, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা কিংবা খিঁচুনির মতো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার সঠিক চিকিৎসা করা জরুরি। ঘরের তাপমাত্রা, পর্দা, বিছানাপত্র এবং পোশাকের মতো পারিপার্শ্বিক উপাদানগুলোও মূল্যায়ন করতে হবে। ঘুমানোর একটি নির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান সময়সূচি তৈরি করা এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উচিত।
ঘুমের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিশু বিছানায় অস্থির থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর ঘরে গিয়ে তাকে সংক্ষেপে সান্ত্বনা দিতে হবে। এই অভ্যস্তকরণের শুরুতেই শিশুর আচরণ সাময়িকভাবে কিছুটা খারাপ হতে পারে, যা পরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। বাড়ির কোলাহল দূর করা, শোবার ঘরে আলোর প্রবেশ কমানো, ঘর ঠান্ডা রাখা এবং আরামদায়ক কাপড়ের বিছানাপত্র ব্যবহার করা উচিত। ওষুধ-বহির্ভূত এসব ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন বাস্তবায়নই এই সমস্যার মূল সমাধান। সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পদ্ধতির পাশাপাশি এই কৌশলগুলো এএসডি আক্রান্ত শিশুর জীবনমান উন্নত করতে এবং পরিবারের মানসিক কষ্ট লাঘব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লেখক : কনসালট্যান্ট, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার ও চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল, ঢাকা