ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইসরায়েল। হামলাকারীদের এলাকা ধ্বংস করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ফিলিস্তিনিদের ভবন ও বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওই হামলায় আরও তিন সেনা আহত হয়েছেন। পরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে দুই হামলাকারী নিহত হন।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে এসেছেন, সেটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর জন্যও ইসরায়েল প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।
পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে। পাশাপাশি চার দিন পর ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
বিবিসি যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে ইসরায়েলি সেনা ও বন্দুকধারীদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে দুই বন্দুকধারীকে একটি গাড়ি থেকে নেমে চেকপোস্টে থাকা সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা যায়। তাদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র ছিল বলে ফুটেজে প্রতীয়মান হয়। পরে সেনারা পাল্টা গুলি চালান।
ঘটনাস্থল থেকে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, হামলাকারীদের বসবাসের এলাকা ‘ধ্বংস করে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হবে’।
তিনি আরও জানান, পশ্চিম তীরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেছেন। তবে কবে এ অভিযান শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাসের শহর হেবরন এবং পাশের হালহুল শহরের চারপাশে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘদিনের একটি চর্চা। তবে ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নীতির সমালোচনা করে একে সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে ইসরায়েলের আগের সামরিক অভিযানের উদাহরণ টেনেছেন। সেসব অভিযানে আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে গাজা বা লেবাননের মতো সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে হামলার আশঙ্কা নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধী নেতারা সরকারকে দুর্বল করছেন। ভবিষ্যতে ইসরায়েলে কোনো হামলা হলে তার জন্য বিরোধী নেতারাও দায়ী থাকবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিরোধী নেতারা নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট হামলাকারীদের প্রতিহত করা ব্যক্তিদেরও প্রশংসা করেছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামলাকারীদের গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ধারণা, বন্দুকধারীরা কাছের রুট ৩৫ সড়কে আরও বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পথে চেকপোস্টের মুখোমুখি হওয়ায় তারা সেখানেই গুলি চালাতে শুরু করেন।
এদিকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘের তথ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছরের শুরু থেকে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে পশ্চিম তীরে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় পশ্চিম তীরে চারজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে শুক্রবারের হামলায় নিহত দুই সেনার হিসাব ওই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।
হেবরনে নতুন করে বাড়িঘর ধ্বংস এবং পশ্চিম তীরে বড় সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারিতে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু সরকারের নিরাপত্তানীতিও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।