কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যা মামলা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়া মো. হেলালের সঙ্গে নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর কথিত প্রায় ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের এক ফোনালাপ ঘিরে সামনে এসেছে নতুন কিছু অভিযোগ। ওই ফোনালাপে হত্যার পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আটক হওয়া মো. হেলাল (২৫) বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে বলে জানা গেছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে স্থানীয় জনতা। তারপর থেকে হেলাল কারাবন্দি আছে।
এ প্রতিবেদকের হাতে আসা ফোনালাপের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার হাত কেটে ফেলার জন্য তাকে ভাড়া করা হয়েছিল বলে দাবি করেন ফোনালাপের অন্য প্রান্তে থাকা হেলাল। আর এ কাজের জন্য জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার তাদের ভাড়া করেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়। হেলাল বলেন, আলমগীর শিকদার তাদের বলেছিল যেভাবেই হোক তার (জাহাঙ্গীর) একটা হাত কেটে ফেলতে হবে, এতে যদি সে মারা যায় তাহলেও।
ফোনালাপের রেকর্ডে আরও শোনা যায়, ‘পরশুদিন জেলে খোকা ভাই আসছিল তখন আমাদের খুব গালাগাল করে, কুত্তার বাচ্চারা, তোরা আলমগীর ভাইয়ের নাম কেন বলতে গেলি, কে এখন তোদের বাঁচাবে। আমাদের নিষেধ করা ছিল তার (আলমগীর) নাম বলা যাবে না, তাহলে আমাদের জামিন করাবে কে। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছি, এ কাজ করিয়েছে আলমগীর, এই নাম (আলমগীর) বললে আমাদের বেশি বেশি মারে। আরেকটা কথা শোনেন, কয়েকদিনের মধ্যেই খোকাকে রিমান্ডে নেবে; কিন্তু আলমগীর এর নাম বলবে না। ওরা আর একটা গেইম করতেছে। বিশ্বাস করেন আমি তার (খোকা) মাধ্যমে আসছি, কিন্তু খোকা আলমগীর ভাইয়ের জন্য আমাদের নিয়ে আসছে।’
এ ফোনালাপের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে যোগাযোগ করা হলে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বলেন, আমাদের এলাকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে খবর আসে যে, একজন আমার সঙ্গে জেল থেকে কথা বলবে। আর সে হলো ভাড়াটে খুনি হেলাল। তারপর কথা হয়, সে কীভাবে আসছে, কে আনছে, সবকিছু বলেছে। আলমগীর তাকে ভাড়া করে এনেছে, এটা বলেছে। এসব শোনার পর তাদের পারিবারিক মতামত কী—এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসলিমা আক্তার বলেন, আলমগীর যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, এটা আমরা সবাই আগে থেকেই সন্দেহ করেছি। সবাই এ হত্যার সঠিক বিচার চাচ্ছে। আলমগীর শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে বলেন, ‘না, আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই, কোথায় আছে, জানি না।’ প্রায় ১০-১১ দিন আগে খুনি জেল থেকে তাকে ফোন দিয়েছিল বলেও জানালেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী।
এদিকে, বিভিন্ন সূত্র এবং আলমগীর শিকদারের ফেসবুক আইডি থেকে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আলমগীর শিকদার সুইজারল্যান্ডে আছেন। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যে ছেলের ১৬৪ হয়েছে অনেকদিন আগে তার বক্তব্য এখন কীভাবে আসে। আমি জড়িত থাকলে আইনে ধরল না কেন। আমি এখন দেশের বাইরে আছি আবার দেশে আসব।’ তিনি আরও বলেন, যে ছেলে কথা বলেছে, সে তো আমার নাম বলে নাই, খোকার নাম বলেছে। তাহলে খোকা বলুক আমার নাম, আমি জড়িত। আমার ভাইয়ের স্ত্রী আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান, সে তো এখন আওয়ামী লীগের টান টানবেই। আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করবে। আমিও দেশে এসে সংবাদ সম্মেলন করব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীর ও তার ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ ছিল। সেই বিরোধ থেকেই আলমগীরের মনে ক্ষোভ-হিংসার সৃষ্টি হয়েছিল বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।
গত ১৫ জুলাই রাতে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর নিজ বাড়ির সামনে নির্মমভাবে খুন হন। ১৮ জুলাই স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় মামলা করেন। জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, অন্য একজনের মাধ্যমে ফোনালাপ সম্পর্কে শুনেছি, কিন্তু এখনো রেকর্ডটা শুনিনি। আমি এ বিষয়ে ডিবির মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব।
তাসলিমা আক্তার চৌধুরী আরও জানান, ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার শাস্তির দাবিতে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল করবে মিঠামইনবাসী।