দেশে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়মিত কঠোর অভিযান চলমান রয়েছে। এর পরও মাদক জব্দের পরিসংখ্যানে উঠে আসছে সরবরাহের ভয়াবহ চিত্র।
দেশে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়মিত কঠোর অভিযান চলমান রয়েছে। এর পরও মাদক জব্দের পরিসংখ্যানে উঠে আসছে সরবরাহের ভয়াবহ চিত্র।
এদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে তিন কোটি চার লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৩ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে (প্রতিদিন এক লাখ ৬৯ হাজারের বেশি), যা গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিদিন ৫০ হাজার পিস বেশি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, শরীফার মতো অনেকেই ছদ্মবেশে মাদক কারবারে জড়াচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলমান রয়েছে।
মিয়ানমার থেকে নাফ নদ হয়ে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে : ইয়াবার প্রধান প্রবেশপথগুলোর একটি কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে নাফ নদ, উপকূলীয় এলাকা এবং সীমান্তবর্তী দুর্গম পথ ব্যবহার করে দেশের ভেতর ইয়াবা আনা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনও ইয়াবা পাচারের ধরনকে প্রভাবিত করছে। সীমান্ত থেকে ঢাকায় ইয়াবা পৌঁছানোর পর তা ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন জেলা ও শহরে। কখনো গণপরিবহন, কখনো ব্যক্তিগত গাড়ি, আবার কখনো শরীরের ভেতর লুকিয়েও চালান বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানো হয়।
ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, পাচারকারীরা এখন মাদক বিক্রিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন মার্কেট প্লেস, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, কুরিয়ার সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ইয়াবা শরীরে নিয়ে, জুতা, হাঁটার লাঠি ও গাড়ির টায়ারে লুকিয়ে, নারী ও শিশুদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করেও পাচার করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কঠোর এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অভিযান চলমান রয়েছে।’
আমার ছেলের ফাঁসি চাই : গত বুধবার কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর এলাকায় মাদকের টাকার জন্য মা ও বোনকে মারধরের পর আগুন দিয়ে ঘর পুড়িয়ে দেয় ফুল মিয়া (৩২) নামের এক যুবক। ঘটনার পর অভিযুক্তকে আটক করেছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, আগুনে ঘরের সব আসবাব, কাপড়চোপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ১৫টি হাঁস ও প্রায় ৪০টি দেশি মুরগি পুড়ে গেছে।
নির্যাতনের শিকার মা রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে প্রায় প্রতিদিন নেশা করে বাড়িতে এসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া ও মারধর করত। কখনো কখনো দা নিয়ে কোপাতে আসত।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুবিনা বলেন, ‘আমি আমার ছেলের ফাঁসি চাই। যদি ফাঁসি না হয়, অন্তত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। নয়তো সে আমাদের মেরে ফেলবে।’
কুলিয়ারচর থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ফুল মিয়াকে আটক করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
ধরা পড়ছে বাহক, মূল হোতারা আড়ালে : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বড় বড় চালানসহ বাহক ও খুচরা পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়মিত সামনে এলেও মাদক নেটওয়ার্কের শীর্ষ অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও সমন্বয়কারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ একটি চালান জব্দ হওয়ার অর্থ শুধু কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ ইয়াবা বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করে না যে ওই চালানই পুরো সরবরাহব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে।’
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে একের পর এক বড় চালান ধরা পড়া, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার এবং ভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা—সব মিলিয়ে দেশে ইয়াবার সরবরাহব্যবস্থা যে বহুমাত্রিক, তারই চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই মাদকবিরোধী অভিযান, মাদক পাচার, কেনাবেচা ও ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব। কারণ প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সংঘবদ্ধ চক্র এই ব্যবসায় জড়িত।’