শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলের জাফনা এলাকায় একটি গণকবর থেকে ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ও নবজাতকের দেহাবশেষও রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজের সময় মানুষের দেহাবশেষ পাওয়ার পর খনন শুরু হয়।
আগস্টে ওই গণকবরের তৃতীয় ধাপের খনন শেষ করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এটি শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর।
চেম্মানিতে গণকবর থাকার কথা অবশ্য এর আগেও শোনা গিয়েছিল। দেশটির গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দণ্ডিত এক সেনাসদস্য আদালতে দাবি করেছিলেন, ওই এলাকায় শত শত মানুষের মরদেহ পুঁতে রাখা হয়েছিল। তবে এতদিন এ দাবির পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানা যায়।
নতুন করে গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে আশার পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। অনেক তামিল পরিবারের বিশ্বাস, এসব মরদেহ গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তিদের হতে পারে। তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ বছর ধরে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ চলে। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ সংঘাতে আনুমানিক ১ লাখ মানুষ নিহত হন। এ সময় প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের অধিকাংশই তামিল।
যুদ্ধ চলাকালে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ও এলটিটিই উভয়ের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী এলটিটিইর কাছ থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর চেম্মানি এলাকা উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত অঞ্চলে পরিণত হয়। সেখানে সেনাশিবির, তল্লাশিচৌকি ও নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপন করা হয়েছিল।
চেম্মানি এলাকায় নিখোঁজদের বিষয়ে বহু বছর ধরেই অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাফনার একটি তল্লাশিচৌকি থেকে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যায় বলে তার মেয়ে জেয়ারুবি জেয়াপালান জানিয়েছেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সেনাশিবির ও থানায় খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
এ ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারাস্বামী নিখোঁজ হন। ১৯৯৮ সালে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয় কলম্বোর একটি আদালত। কৃষান্তির পরিবারের আরও তিন সদস্যকেও হত্যার দায়ে তাদের দণ্ডিত করা হয়। পরে চেম্মানি এলাকায় তাদের মরদেহ পাওয়া যায়।
ওই মামলায় দণ্ডিত এক সেনাসদস্য আদালতে দাবি করেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিহত ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে চেম্মানিতে কবর দেওয়া হয়েছিল। তার বক্তব্যের পর ১৯৯৯ সালে সেখানে প্রথম দফা খনন চালানো হয় এবং ১০টির বেশি মানবকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। তবে এরপর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
শ্রীলংকার মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চেম্মানির বর্তমান গণকবরটি সাধারণ কবরস্থানের মতো নয় এবং প্রচলিত হিন্দু দাফনপ্রথার সঙ্গেও এর মিল নেই। বেশিরভাগ দেহাবশেষ পোশাকহীন অবস্থায় ঘনভাবে রাখা ছিল। কিছু ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি মরদেহ পাওয়া গেছে। মাত্র এক থেকে দুই মিটার গভীরেই কবরগুলো পাওয়া যায়। কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দেহ অবৈধভাবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার পর দাফন করা হয়ে থাকতে পারে।
উদ্ধার করা সব দেহাবশেষ বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে আদালতের নির্দেশে রাখা হয়েছে। প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক রাজ সোমাদেবা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। দেহাবশেষের বয়স নির্ধারণে কিছু নমুনা বিদেশে পাঠানো হতে পারে। মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ জানতে পৃথক চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরীক্ষাও প্রয়োজন হবে।
শ্রীলংকায় গত কয়েক দশকে ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। তবে সেগুলোর কোনোটি এখন পর্যন্ত জোরপূর্বক নিখোঁজ বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা যায়নি এবং কোনো ঘটনাতেই বিচারের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ হয়নি। ২০১৮ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মান্নারে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার হলেও তদন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে সরকার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে বলে জানিয়েছে। তবে তামিলদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক তদন্তের ব্যবস্থা করার বিরোধিতা করছে সরকার।
শ্রীলংকার বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কার জানিয়েছেন, চেম্মানিতে খননকাজ চলবে। কঙ্কাল পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ এবং পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। নিখোঁজদের পরিবারগুলোকেও ডিএনএ নমুনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অতীতের নিখোঁজ ও যুদ্ধকালীন অপরাধের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরিবারগুলোর মধ্যে আস্থা কমে গেছে। জাতিসংঘও ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়ানো পরিবারগুলোর কাছে চেম্মানির গণকবর তাই শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্য জানার সম্ভাব্য শেষ সূত্রগুলোর একটি। বহু বছর অনিশ্চয়তার পর তারা এখন সত্য ও বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।