কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি ও দরিয়ানগর সৈকতে পরিচালিত প্যারাসেইলিং কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে খুলনা থেকে বেড়াতে আসা এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত দুই বছরে অন্তত ১০ পর্যটক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল ও আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
শনিবার দরিয়ানগরে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ প্রতিষ্ঠানের রাইডে অংশ নিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন খুলনা সদরের বানিয়াখামার এলাকার শেখর রায়ের ছেলে শৌভিক রায় (৩০)। নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে তিনি সমুদ্রে পড়ে যান। উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল বলেন, দুপুর ২টা ১০ মিনিটে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান বলেন, দুর্ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের বিচকর্মী মাহবুব আলম জানান, খুলনা থেকে আসা নয়জনের একটি দল কক্সবাজারে বেড়াতে এসে কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠেন। পরে দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করার সময় শৌভিক রায় সমুদ্রে পড়ে যান।
দরিয়ানগরের ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর মালিক মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, তাদের চারটি প্যারাসেইলিং, দুটি জেট স্কি ও পাঁচটি স্পিডবোট রয়েছে। শনিবার তার প্রতিষ্ঠানের রাইডেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট কেনার সময় পর্যটকদের একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়, যেখানে দুর্ঘটনার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না বলে উল্লেখ থাকে। ফলে নিরাপত্তার পুরো দায় কার্যত পর্যটকের ওপরই বর্তায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগরে একটি প্যারাসেইলিং রাইড থেকে ছিটকে পড়ে এক পর্যটক ঝাউগাছে আটকে যান। ওই ঘটনায় জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছিল।
এরও আগে গত বছরের ২০ মে দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে সমুদ্রে পড়ে আহত হন এক নারী পর্যটক। সে সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে উড্ডয়ন করানোর অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে আবারও কার্যক্রম চালু হয়।
‘স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস’-এর ব্যবস্থাপক নুর মোহাম্মদ বলেন, আকাশে ওঠার আগে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক সময় তারা নির্দেশনা অনুসরণ না করায় দুর্ঘটনা ঘটে।
পর্যটকদের অভিযোগ, নিয়ম না মেনে প্যারাসেইলিং পরিচালনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে এক সময়ের রোমাঞ্চকর এই বিনোদন এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দরিয়ানগর ও হিমছড়ির প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিম্নমানের ও পুরোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।
জানা গেছে, গত জুনে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা প্রয়োজনীয় ফি জমা দিলেও প্রশাসন এখনো নবায়ন করেনি।
প্যারাসেইলিংয়ের জন্য ১০ মিনিটের রাইডে দেড় হাজার থেকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পর্যটকদের বীমার আওতায় আনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রশাসনের অগোচরে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হচ্ছিল। পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দরিয়ানগরের ওই প্রতিষ্ঠানে এর আগেও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কয়েকদিন পর আবার চালু করা হয়। একের পর এক দুর্ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।