সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন

ভারতের ছাত্র আন্দোলনে ককরোচ বিপ্লব

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ০ বার

ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু বাঁক নেয় যা সমসাময়িক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়। ইতিহাসে সব সময় প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোই যে পরিবর্তন আনবে, এমন কোনো কথা নেই। কখনও কখনও পরিবর্তনের হাওয়া আসে একেবারে অভাবনীয় জায়গা থেকে, অদ্ভুত কোনো নামে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভারতের রাজনীতি ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য এবং অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলো। রাজপথে নেমে আসা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আর এই ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে এমন একটি দল, যার নাম শুনলে যে কারও কপালে ভাঁজ পড়তে পারে- ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP)। কীভাবে একটি তেলাপোকার নামে গড়ে ওঠা দল ভারতের মতো বিশাল একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিল? কারা এই আন্দোলনের নেপথ্যে? কীভাবেই বা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই অদ্ভুত নামের পতাকাতলে সমবেত হলো? সমকালীন রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে অভিনব এই রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করা হলো এই নিবন্ধে। জানাচ্ছেন শামস বিশ্বাস

ক্ষোভের নেপথ্য কারণ

যেকোনো বড় গণ-আন্দোলনের পেছনেই দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা ক্ষোভের বারুদ থাকে। ভারতের এই সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এই আন্দোলনের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে মূলত দুটি বিষয়- দুর্নীতি ও বেকারত্ব।

নিট (NEET-UG) প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি : ভারতের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির সবচেয়ে বড় প্রবেশিকা পরীক্ষা হলো ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা NEET। লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিশাল কেলেঙ্কারি সামনে আসে। দেখা যায়, মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে টাকার জোর বেশি প্রভাব ফেলছে। রাতের অন্ধকারে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছে প্রশ্নপত্র। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যখন দেখলেন তাদের বহু নির্ঘুম রাতের স্বপ্নের কোনো মূল্য এই ব্যবস্থার কাছে নেই, তখন তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়।

লাগামহীন বেকারত্ব : ভারতের যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব গত কয়েক দশকে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা চাকরির আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন একটি সম্মানজনক পেশা জোটাতে পারছিলেন না, তখন তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছিল গভীর হতাশা ও ক্ষোভ। শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সরকারের উদাসীনতা তরুণদের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তা কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল।

প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্য : ঠিক এ রকম একটি টালমাটাল পরিস্থিতিতে, ২০২৬ সালের ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু বেকার যুবক এবং অ্যাক্টিভিস্টদের দিকে ইঙ্গিত করে ‘তেলাপোকা’ (cockroaches) এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও তিনি পরে জানিয়েছিলেন যে তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং প্রসঙ্গটি ভিন্ন ছিল, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। তরুণদের মাঝে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। সিস্টেমের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা এই মন্তব্যই জন্ম দেয় এক নতুন বিপ্লবের।

অদ্ভুত নামের আড়ালে অপ্রতিরোধ্য শক্তি

‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা। প্রাণীটি মানুষের কাছে বিরক্তির, অনেক ক্ষেত্রে ঘৃণারও। তাহলে একটি রাজনৈতিক দলের নাম কেন এমন হবে?

এই দলের নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং দর্শন। প্রধান বিচারপতির সেই মন্তব্যের ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১৬ মে ২০২৬ তারিখে অনলাইনে একটি স্যাটায়ারিক্যাল বা ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। দলের প্রতিষ্ঠাতারা এর নামকরণের পেছনে যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তা আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাসে এক অনন্য মাস্টারস্ট্রোক। তাদের বক্তব্য ছিল, ‘শাসকগোষ্ঠী ও ক্ষমতাধররা সাধারণ মানুষ এবং বেকার তরুণদের সব সময় পোকামাকড় বা তেলাপোকার মতোই তুচ্ছ মনে করে এসেছে। তারা ভেবেছে, চাইলেই আমাদের পিষে মারা যায়। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরও পৃথিবীতে যদি কোনো প্রাণী বেঁচে থাকে, তবে তা হলো তেলাপোকা। আমরা সেই তেলাপোকা। আমাদের পিষে ফেলা যায় না, আমরা টিকে থাকি এবং আমরা সর্বত্র আছি।’ প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি জোক বা মিম পেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এটি খুব দ্রুতই তরুণদের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে সক্ষম হয়। প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর গালভরা প্রতিশ্রুতিতে বীতশ্রদ্ধ তরুণসমাজ এই ব্যঙ্গাত্মক অথচ অত্যন্ত গভীর অর্থবহ নামটিকে নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে লুফে নেয়।

কারা অংশ নিয়েছিলেন আন্দোলনে

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর সর্বজনীনতা এবং অদ্ভুত সব নিয়মকানুন। এটি কোনো নির্দিষ্ট বামপন্থি বা ডানপন্থি আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মূলত সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবকরাই ছিলেন এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি। তবে ককরোচ জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য যে শর্তগুলো দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল রীতিমতো হাস্যকর এবং একই সঙ্গে প্রচলিত সিস্টেমের গালে এক বিরাট চড়।

দলের সদস্য হওয়ার শর্তগুলো ছিল : ১. সদস্যকে অবশ্যই বেকার হতে হবে (বাধ্যতামূলক, ইচ্ছাকৃত বা নীতিগতভাবে)। ২. শারীরিকভাবে চরম অলস হতে হবে। ৩. দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা অনলাইনে থাকতে হবে (বাথরুম ব্রেকসহ)।

এই অদ্ভুত শর্তগুলো আসলে ছিল ভারতের বিশাল বেকার গোষ্ঠীর প্রতি এক ধরনের সমবেদনা এবং সিস্টেমের ব্যর্থতার প্রতি ব্যঙ্গ। যারা কোনোদিন রাজনীতি করেননি, সেই সাধারণ শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন।

রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের সমর্থন

আন্দোলনটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারাও এর প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য হন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদবের মতো নেতারা প্রকাশ্যে সিজেপির দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেন।

শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, কুণাল কামরার মতো স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান থেকে শুরু করে নাসিরুদ্দিন শাহের মতো কিংবদন্তি অভিনেতারাও এই আন্দোলনে সমর্থন জানান। সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটান প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক। তিনি নিজেই নিজেকে দলের ‘সম্মানসূচক তেলাপোকা’ (Honorary Cockroach) হিসেবে ঘোষণা করে আন্দোলনে যোগ দেন, যা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

নতুন প্রজন্মের নেতা অভিজিৎ দিপকে

যেকোনো সফল আন্দোলনের পেছনে একটি দক্ষ মস্তিষ্কের প্রয়োজন হয়। ককরোচ জনতা পার্টির ক্ষেত্রে সেই মস্তিষ্ক হলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে (Abhijeet Dipke)। ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ কোনো গতানুগতিক ছকে বাঁধা রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি পেশায় একজন অত্যন্ত দক্ষ রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ (Political Communications Strategist)। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সদ্য ভারতে ফিরেছিলেন। যখন দেশের যুবসমাজ ক্ষোভে ফুঁসছে, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পুরনো স্লোগান বা ভাঙচুরের রাজনীতি দিয়ে এই পচে যাওয়া সিস্টেমের পরিবর্তন সম্ভব নয়। দরকার এমন কিছু, যা সিস্টেমকে তার নিজের ভাষায় এবং রসবোধের সঙ্গে জবাব দেবে। ৬ জুন ২০২৬ তারিখে অভিজিৎ যখন লন্ডন হয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে নামেন, তখন তার উপস্থিতি ছিল একেবারে সাদামাটা অথচ অত্যন্ত প্রতীকী। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি বা দামি গাড়ির বহর নয়, তাকে দেখা যায় একটি সাধারণ কালো হুডি জ্যাকেট পরা অবস্থায়। হাতে ধরা ভারতের সংবিধান। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে তিনি কোনো বিশাল জনসভায় যাননি, বরং সাধারণ মানুষের মতো হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরের দিকে। তার এই প্রতীকী যাত্রা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারাদেশের লাখ লাখ তরুণকে মুহূর্তের মধ্যে উজ্জীবিত করে। তিনি কোনো উসকানিমূলক ভাষণ দেননি, কেবল ব্যঙ্গ এবং অহিংস প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিলেন।

সোশ্যাল মিডিয়া গ্রোথ মাস্টারক্লাস

একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে সিজেপির ডিজিটাল উত্থান ছিল অভাবনীয়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে ককরোচ জনতা পার্টির ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়! এই সংখ্যা ভারতের প্রধান এবং শতাব্দীপ্রাচীন রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং কংগ্রেসের সম্মিলিত ফলোয়ার সংখ্যাকেও পেছনে ফেলে দেয়। কোনো পেইড প্রমোশন ছাড়াই, কেবল নিখুঁত মিম, ব্যঙ্গাত্মক ছোট ভিডিও এবং অর্গানিক রিচের মাধ্যমে তারা কোটি কোটি মানুষের কাছে নিজেদের ন্যারেটিভ পৌঁছে দেয়। ডিজিটাল গ্রোথ এবং ক্যাম্পেইনের ইতিহাসে এটি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

জয়পুরে থাপ্পড় এবং অহিংসার চূড়ান্ত পরীক্ষা

আন্দোলন চলাকালে রাজস্থানের জয়পুরে একটি রোড শো করছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। রোড শো চলাকালে ভিড়ের মধ্যে থেকে এক উগ্রপন্থি ব্যক্তি হঠাৎ অভিজিতের সামনে এসে তাকে সজোরে থাপ্পড় মারে। পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারত, বেধে যেতে পারত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অভিজিৎ তাৎক্ষণিকভাবে তার অনুসারীদের শান্ত থাকতে বলেন। তিনি হাসিমুখে সেই ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন এবং সম্পূর্ণ অহিংসভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তার এই পদক্ষেপ তাকে রাতারাতি একজন পরিণত এবং জাতীয় মাপের নেতায় রূপান্তরিত করে।

সংসদ অভিমুখে ‘তেলাপোকা’ মার্চ

২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই আন্দোলন তার চূড়ান্ত রূপ নেয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবক দিল্লির সংসদের দিকে ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু করেন। পুলিশ তাদের আটকাতে ব্যারিকেড তৈরি করে, টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পিছু হটেননি। তারা কোনো ইটপাটকেল ছোড়েননি, বরং তাদের হাতে ছিল বিশাল বিশাল ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড। পুলিশ মারমুখী হলেও আন্দোলনকারীরা তাদের দিকে খেলনা তেলাপোকা ছুড়ে দিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন। অহিংস কিন্তু চরম ব্যঙ্গাত্মক এই প্রতিবাদের সামনে ভারতের শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও একসময় অসহায় বোধ করতে শুরু করে।

স্লোগানে সৃজনশীলতা

আন্দোলনের স্লোগানগুলো ছিল অত্যন্ত সৃজনশীল। যেমন-

‘সিস্টেমে পোকা ধরেছে, তেলাপোকা করবে সাফ!’

‘আমরা বেকার, আমরা অলস, কিন্তু আমরাই আগামীর ভারত!’

চূড়ান্ত পরিণতি : শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং একটি নতুন দিনের সূচনা

জুলাই মাসের শেষদিকে এই আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে পুরো ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো ভারতের এই অভিনব ‘ককরোচ বিপ্লব’ নিয়ে বড় বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে। সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি চাপ প্রবল হতে থাকে।

অনলাইনে হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং, রাজপথে লাখো তরুণের অহিংস অবস্থান এবং ক্রমাগত ব্যঙ্গাত্মক আক্রমণের মুখে সরকার বুঝতে পারে যে, প্রথাগত শক্তি প্রয়োগ করে এই নতুন প্রজন্মের আন্দোলন দমন করা অসম্ভব। অবশেষে সরকার বাধ্য হয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে।

লাখ লাখ শিক্ষার্থীর এই অভাবনীয় চাপের মুখে পড়ে সরকার নিট (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত বিজয়টি আসে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। লাখ লাখ তরুণ যখন দিল্লির রাস্তায় অবস্থান করছেন, তখন খবর আসে- শিক্ষাব্যবস্থার এই চরম অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন।

খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ভারতজুড়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। যে তেলাপোকাদের সমাজ কীট বলে অবজ্ঞা করেছিল, সেই তেলাপোকারাই সেদিন প্রমাণ করেছিল যে, দেশের মসনদ কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

শেষ কথা

ভারতের এই ছাত্র আন্দোলন এবং ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ক্লাসিক কেসস্টাডি হয়ে থাকবে। তারা প্রমাণ করেছে যে, যখন প্রথাগত রাজনীতি ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করেই প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নেয়।

এই আন্দোলন এটিও প্রমাণ করেছে যে, আজকের দিনে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে শুধু লাঠি বা পেশিশক্তির প্রয়োজন হয় না, সঠিক পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিখুঁত ব্যবহার, তীক্ষè রসবোধ এবং ব্যঙ্গাত্মক উপায়েও যে একটি শক্তিশালী সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া যায়- ককরোচ জনতা পার্টি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হয়তো একটি প্রাথমিক বিজয়, কিন্তু ভারতের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় যে বিশাল আত্মবিশ্বাসের বীজ এই আন্দোলন বপন করে দিয়েছে, তার রেশ রয়ে যাবে বহু দশক ধরে। ইতিহাস যখন রাজনীতি, সমাজ এবং ছাত্র আন্দোলনের কথা লিখবে, তখন সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একটি অদ্ভুত প্রাণীর নাম- তেলাপোকা বা ককরোচ, যারা অবজ্ঞা আর ধুলা থেকে উঠে এসে জয় করেছিল রাজপথ, বাধ্য করেছিল ক্ষমতার মসনদকে মাথা নোয়াতে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ