বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আন্দোলনকারীদের উসকে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে: সর্ব মিত্র চাকমা এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন দাবি ভুক্তভোগীর, অস্বীকার অভিযুক্তের, নারী সংক্রান্ত অভিযোগের কথা বলে বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘ ২০ বছর পর কলকাতায় যাচ্ছেন তসলিমা নাসরিন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান মির্জা ফখরুলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ‘স্টার্টআপ উদ্যোক্তাকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা করার চেষ্টা করব’ সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলার বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি অবসরে আপিল বিভাগের বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বাঁধ মেরামত ও নদী তীর সংরক্ষণে জোরালো ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

চট্টগ্রামে উন্নতি, চোখ রাঙাচ্ছে সিলেটে

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার

চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। টানা কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর হাজারো মানুষ এখনো দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।

এদিকে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বাড়তে থাকায় আগামী দুই দিনে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তারা জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৯টায় সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি তিনটি জেলার চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। এ ছাড়া নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সাতকানিয়ায় উন্নতি, বাঁশখালীতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি: সাতকানিয়ায় বন্যার পানি কমতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছেন। তবে ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই তাদের। ঘরের ভেতরে কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়ে দিন কাটছে অনেক পরিবারের।

অন্যদিকে বাঁশখালীতে এখনো পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নতুন করে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আবারও বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীতে এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পানি নামতে শুরু করায় কৃষিজমি, মাছের ঘের, সড়ক, বসতঘর ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট, জলবাহিত রোগের আশঙ্কা এবং সাপে কাটার ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রোববার থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষও ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছেন।

সাতকানিয়া উপজেলার ডেমশা ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে ছিল। এখন পানি কিছুটা কমলেও ঘরের ভেতরে কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র ও খাবারের সংকট নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। দ্রুত পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রয়োজন।’

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘শনিবার পর্যন্ত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন এরই মধ্যে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। পানি নামতে শুরু করেছে, সার্বিক পরিস্থিতিরও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ডলু নদী-সংলগ্ন নিচু এলাকা এখনো পানির নিচে থাকায় অনেক পরিবার বাড়ি ফিরতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে।’

বাঁশখালীর বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় দেখা গেছে, অসংখ্য বাড়িঘর এখনো পানির নিচে রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি উঠেছে। অনেক পরিবার নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ।

বাঁশখালীর পুইছড়ি এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির আশপাশের রাস্তা, নিচু জমি সবই পানির নিচে। আমরা ঘরেই আটকে আছি। সকালে বৃষ্টির পর থেকে পানি আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ত্রাণ বিতরণ চললেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে রয়েছেন অনেক পরিবার।

বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপজেলায় এখনো অন্তত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নতুন বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আরও এক থেকে দুই ইঞ্চি বেড়েছে। আজ (গতকাল) বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হতো।’

কক্সবাজারে ক্ষতের চিহ্ন ভয়াবহ: বন্যা উপদ্রুত উপজেলা চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁওয়ে পানি কমতে শুরু করেছে। গতকাল সকাল থেকে কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে কক্সবাজারের প্রধান দুই নদী মাতামুহুরি, বাঁকখালী নদীতে বন্যার পানি তলানিতে ঠেকেছে। ১০ দিন পর গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় কক্সবাজারের আকাশে সূর্যের খানিক দেখা মিলেছে। জেলার সর্বত্র বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ফুটে উঠেছে তীব্রভাবে। জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি।

এবারের টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে এবং পানিতে ডুবে মারা গেছে ৩০ জন।

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ব্যাপক প্রাণিসম্পদ ধ্বংস হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় বিভাগের পাঁচ জেলায় ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৭টি গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। এতে খামার ও পশু খাদ্য ধ্বংসসহ সব মিলিয়ে আনুমানিক ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

জুলাইজুড়ে বৃষ্টির এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে: গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে কুমিল্লায় ১৩৭ মিলিমিটার। এ সময়ে ঢাকায় বৃষ্টি ঝরেছে ৪১ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক কালবেলাকে বলেন, ১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কম থাকবে। এবং মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে ফের বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়তে পারে। যদিও নিম্নচাপের প্রভাব কমেছে, বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু এখনো সক্রিয় থাকায় পুরো মাসজুড়েই বৃষ্টির ধারা বজায় থাকতে পারে।

তিনি জানান, সাধারণত এ ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে এক থেকে তিন দিন তার স্থায়িত্ব থাকে। মাঝেমধ্যে তার ব্যতয় ঘটে। এবারও অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এবারই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বিষয়টা এরকম নয়। বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে জুলাই মাসের আগের অনেক আমাদের রেকর্ড রয়েছে।

জলাবদ্ধতা পেরিয়ে পরীক্ষার হলে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা: টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও থেমে থাকেনি এইচএসসি পরীক্ষা। কোথাও কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, কোথাও নৌকা-ভ্যানের সহায়তায় পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। দুর্যোগের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তাদের। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলও পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।

গতকাল সারা দেশে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়েছে। অন্য আটটি বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে থাকে। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকরাও। তবে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি দুর্বিষহ। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে হাঁটু ও কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করে পরীক্ষার্থীরা। বিভিন্ন কেন্দ্রের এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল: বন্যাকবলিত দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এসব জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে। কোথাও যেন কোনো রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, সেজন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও অতিরিক্ত মেডিকেল টিম পাঠানো হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ