অ্যাকাউন্টে টাকা রেখেও লাখ লাখ আমানতকারী প্রয়োজনমতো টাকা তুলতে পারছেন না একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক এবং পাঁচ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। এর বাইরে প্রায় ২০ ব্যাংক ভুগছে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে। এসব প্রতিষ্ঠানও পারছে না গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা প্রদান করতে। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের, যা দেশের আর্থিক নাজুক পরিস্থিতিরই সাক্ষ্য বহন করে।
মঙ্গলবার কালবেলায় প্রকাশিত “ ‘চাহিবা মাত্র’ মিলছে না টাকা” শীর্ষক শিরোনামে এ বিষয়ে বিস্তারিত যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশার। প্রতিবেদন অনুসারে, সম্প্রতি দেশের ব্যাংকিং খাতে যে নজিরবিহীন তারল্য ও মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে, তার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা। ফার্স্ট সিকিউরিটি বা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহকদের আকুতি দেশের লাখ লাখ আমানতকারীর মূর্ত প্রতীক। নিজের অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা থাকার পরও দৈনন্দিন বাজার খরচ বা সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে না পারার মতো ট্র্যাজেডি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা জানি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সীমাহীন দুর্নীতি, ভুয়া ও অস্তিত্বহীন জামানতের বিপরীতে বেনামি ঋণ বিতরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকির পুঞ্জীভূত ফল আজকের এ ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত। ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি যখন পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায় এবং একীভূত হওয়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর ৮৬ শতাংশ ঋণই খেলাপির খাতায় চলে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, খাতের ক্ষত কতটা গভীর। চব্বিশের
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনেক প্রভাবশালী ঋণখেলাপি ও সুবিধাভোগী পলাতক থাকায় ঋণের টাকা আদায় আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর ‘আমানত সুরক্ষা আইন’-এর সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান এবং আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার কারণ হয়েছে। ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির এ বাজারে আমানতকারীদের নামমাত্র মুনাফা দিয়ে তাদের মূল টাকা কেটে রাখা জুলুম হিসেবে দেখছে তারা, যা তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার করদাতাদের টাকায় বাঁচিয়ে রাখার বিষয়েও উঠছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। বাজেট থেকে অর্থ দিয়ে সাময়িক প্রলেপ না লাগিয়ে, প্রয়োজন সংকটের স্থায়ী সমাধান। প্রথমত, আমানতকারীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করে ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার কথা বলছেন কেউ কেউ। দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে খেলাপিদের দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ অনতিবিলম্বে ক্রোক ও বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থার বিষয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন কেউ কেউ।
আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় তুলতে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকার এ চিত্র কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। মানুষ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে ব্যাংকের ওপর। আস্থার সেই ভিত্তি নষ্ট হলে ব্যাংক কিংবা অর্থনীতিকে সচল রাখা কঠিন। ফলে এটা চরম উদ্বেগের। কেননা এরই মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে ব্যাংকে গ্রাহকরা টাকা রাখছেন না। স্মরণে রাখতে হবে, আর্থিক খাতের বিনিয়োগকারী সাধারণ গ্রাহকরা আস্থাহীন হয়ে পড়লে অর্থনীতির জন্য বড় সংকট দেখা দেবে। ফলে তাদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, ব্যাংকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কোনো আমানতকারীর যেন চোখের জল ফেলতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা সঠিক করণীয় ঠিক করবেন।