মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

সরকারে ব্যস্ততা, দলকে চাঙ্গা করার তাগিদ বিএনপিতে

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৪ বার

সরকারে দায়িত্ব পালনের বাড়তি চাপ আর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দৃশ্যমান ভাটা পড়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় বিএনপির দলীয় কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক যোগাযোগ ও দিকনির্দেশনায় ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে অনেক নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন, কমে গেছে মিছিল-মিটিং ও জনসম্পৃক্ততা। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসা দলটির জন্য এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তৃণমূল রাজনীতিকে সচল রাখতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ারও তাগিদ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত পুনর্গঠন, নিয়মিত কর্মসূচি ও কেন্দ্র-তৃণমূল সমন্বয় জোরদার না করলে এই স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ২০ বছর পর সরকার গঠনের সুযোগ পায় দলটি। বিপুল জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় এলেও মাঠের কার্যক্রম না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে দলটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেকেই দলের হাইকমান্ডের দিকনির্দেশনার অভাবে কিছুটা নিষ্ক্রিয়। দলের অন্তঃপ্রাণ নেতারা রাজনীতির মাঠ থেকে দেশ পরিচালনার কাজে সময় দিতে গিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না। যার প্রভাব পড়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। আগের মতো জমছে না নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। মিছিল-মিটিংয়ে রাজপথ কাঁপাতেও দেখা যায় না নেতাদের। পাশাপাশি বিগত সময়ের মামলা

জটিলতা নিয়ে এখনও উদ্বেগে অনেকে। এ ছাড়া মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের অনেক ইউনিটে কমিটি না থাকায় নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সে কারণে দিকনির্দেশনার অভাবেও ঢিমেতালে চলছে বিএনপির রাজনীতি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই সরকারের অংশ হয়ে উঠেছেন। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ড বেগবান করতে মনোনিবেশ করতে পারছেন না। অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ এখন বেশি মনোযোগী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা নিয়ে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণের অপেক্ষায় লবিং-তদ্বিরে ব্যস্ত। আগের মতো দল ও সংগঠনকেন্দ্রিক সময় দেওয়া হচ্ছে না তাদের। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি, আদর্শিক চর্চা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে, যেখানে কর্মীদের মাঝে আগের মতো উদ্দীপনা ও সক্রিয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে না।

কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, নির্বাচনী ধকল ও নতুন সরকারের কার্যক্রম বুঝে উঠতে একটু সময় লাগছে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপিতে পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে। বিএনপির হাইকমান্ডের পরিকল্পনাও রয়েছে সাংগঠনিক গতিশীলতা আনতে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার। শিগগিরই এই পরিকল্পনার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হবে। কেননা হাইকমান্ড মনে করছেন দল পুনর্গঠন হলে ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতারা কিছুটা হলেও মূল্যায়িত হবেন। হতাশা কেটে যাবে, নেতাকর্মীদের মাঝেও ফিরবে চাঙ্গা মনোভাব। নেতৃত্বে ফিরবে গতিশীলতা। তবে এটাও ঠিক, দল যেহেতু দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে; তাই গতানুধিক তেমন কোনো কর্মসূচি থাকবে না। তাই আপাতত ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে হলেও দলের সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে পারলে ভালো হবে। অন্যথায় দলের রাজনীতিতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ধরে রাখা সহজ হয় না।

তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, পদে থেকেও জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক নেতাই ঢাকায় থাকেন। যারা এমপি হয়েছেন, তারাও এখন ঢাকামুখী। ফলে তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। ব্যস্ত ওই সব নেতাকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন কাছে পাচ্ছে না। তাই এবার অন্তত দল পুনর্গঠন করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীর মধ্য থেকে যোগ্য ও ত্যাগীদের পদ-পদবিতে আনা জরুরি। অন্যথায় তৃণমূলে বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘জেলা বিএনপির সভাপতি বা আহ্বায়ক, কিংবা সাধারণ সম্পাদক বা সদস্যসচিব, অঙ্গসংগঠনের কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা ছন্দপতন হয়েছে। তাই এখনই সংগঠন নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। কারণ এক সঙ্গে দল ও সরকারের দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বিশেষ করে মাঠের রাজনীতি ধরে রাখতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে গতিশীল রাখতে সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব দরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করেননি, বরং দলকে দীর্ঘদিন পর একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রোডম্যাপ দিয়েছেন। এই রোডম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তিনি বিএনপির ভেতরে-বাইরে নতুন উদ্দীপনা এনেছেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নেতাকর্মীদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছেন এবং ভোটারদের মনে পরিবর্তনের আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে যুবসমাজ ও নারীদের মধ্যে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। তবে রাষ্ট্রীয় শাসন আর দলীয় সংগঠনÑ এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথ আন্দোলন মোকাবিলায় বিএনপিকে বড় ধরনের সাংগঠনিক বিপর্যয়ে পড়তে হতে পারে।

এ ছাড়াও বৈশ্বিক চলমান পরিস্থিতি দেশে রাজনৈতিক সরকারের সক্রিয়তা বজায় রাখার পাশাপাশি নিষ্ক্রিয় বা কর্মহীন হয়ে পড়া বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ পুনর্স্থাপন করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারি দলের কর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি লাগে না, তবে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা থাকতে হবে। পাশাপাশি জনসেবামূলক কাজে যুক্ত করে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে জনমুখী কর্মসূচিতে জনসাধারণের পাশে তাদের দাঁড়ানোর তাগিদ থাকতে হবে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বার্তা থাকতে হবে যে, রাজনীতির নামে পেশিশক্তি বা সহিংসতা পরিহার করে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক রাজনীতিতে মনোযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে সবার মাঝে ঐক্য ধরে রাখতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল সরকার নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, ‘এখন দুটি কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো পুনর্বাসন আর অন্যটি পুনর্গঠন। বিগত প্রায় ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ নেতাকর্মীকে পুনর্বাসন করতে হবে। দলের ত্যাগীদের সামনে এনে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। যারা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সামনে এনে পুনর্গঠন করতে হবে। দীর্ঘদিন বিগত সরকারি দলের নানা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া বিএনপির সাংগঠনিক কিছুটা দুর্বলতা আছে এটা সত্য। দলের নেতৃত্বের পুনর্গঠন দরকার। শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণ করা উচিত।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, ‘দলের বেশকিছু অঙ্গসংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সংগঠনগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আনার জোর দাবি রয়েছে। দলের হাইকমান্ডও এই বিষয়ে অবগত আছেন। খুব শিগগিরই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদিও বিএনপির দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান। সরকার গঠন করতে কিছু সময় লেগেছে। দলের বেশকিছু লোক সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। সেই জায়গাগুলোতে পুনর্গঠন সময় লাগবে। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আমাদের সময়কে বলেন, ‘দল যখন সরকারে চলে যায় তখন কর্মসূচি বাড়ে তবে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি তুলনামূলক কমে যায়। সেটাও রাজনৈতিক দল বিবেচনায় রাখে। সেক্ষেত্রে বলব- বিএনপি দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এই দল সরকারের গেলেও রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকতে পারে। যেমন ধরুন, আগামী ১ মে শ্রমিক দিবস উপলক্ষে কিন্তু কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শ্রমিকদলের উদ্যোগে সমাবেশ হলেও সেখানে প্রধান অতিথি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাই এক কথায় বলতে গেলে সরকার সক্রিয়, পাশাপাশি দলও সক্রিয় অবস্থায় আছে। তার পরও সরকার যদি কখনও কোনো কারণে সমালোচনার সম্মুখীন হয়, বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, এটা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যম তো সংগঠন। সেটার অংশ হিসেবেই সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কর্মসূচি থাকুক বা কর্মসূচি না থাকুক, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে কার্যক্রম প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগে কিংবা পরে সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে। পাশাপাশি দলের মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের বিষয়েও নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

সরকারি দল বিএনপির রাজনীতি ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে বিরোধী দলের রাজনৈতিক তৎপরতা না থাকারও প্রভাব দেখছেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকারের বাইরের, বিশেষত বিরোধী দল যখন রাস্তার আন্দোলনে সক্রিয় হয়, তখন সরকার থেকেও বেশি সরকারি দলের কার্যক্রম একটু চাঙ্গা হয়। স্বাভাবিক কারণেই দেশে এখন বিরোধী দলের কোনো আন্দোলন রাস্তায় তেমন নেই। সরকারি ও বিরোধী দল এখন সংসদকেন্দ্রিক ভূমিকা পালন করছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ