সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯ অপরাহ্ন

পৃথিবীর আলোচিত ১০ উদ্ধার অভিযান

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার

সম্প্রতি নেপালে সুড়ঙ্গধসের ১০ দিন পর এক চীনা নাগরিককে অবিশ্বাস্যভাবে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা বিশ্ববাসীকে আবারও হতবাক করেছে। মাটির গভীরে, আলো-বাতাসহীন এক বদ্ধ প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গোনা এবং সেখান থেকে ফিরে আসার গল্পগুলো সব সময়ই মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে। প্রকৃতির রুক্ষতা কিংবা মানুষের তৈরি খনি ও সুড়ঙ্গের অন্ধকারে আটকে পড়ার ঘটনা ইতিহাসে নতুন নয়। এ ধরনের প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য স্পৃহা এবং উদ্ধারকর্মীদের হার না মানা মানসিকতার। কখনও এই অভিযানগুলো শেষ হয়েছে উল্লাসে, আবার কখনও তা রূপ নিয়েছে বিষাদময় ট্র্যাজেডিতে। পাঠকদের জন্য আজ তুলে ধরা হলো বিশ্বের ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, শ্বাসরুদ্ধকর ও মর্মান্তিক এমন ১০টি সুড়ঙ্গ, গুহা ও খনি উদ্ধার অভিযানের আদ্যোপান্ত। জানাচ্ছেন শামস বিশ্বাস

কোপিয়াপো খনি, চিলি ২০১০

ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং শ্বাসরুদ্ধকর খনি উদ্ধার অভিযানের কথা উঠলেই সবার আগে আসে চিলির সান জোসে খনির কথা। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট চিলির কোপিয়াপো শহরের কাছে অবস্থিত একটি তামা ও সোনার খনিতে ভয়াবহ ধস নামে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার (২৩০০ ফুট) গভীরে আটকা পড়েন ৩৩ জন খনি শ্রমিক। প্রথম ১৭ দিন বাইরের পৃথিবী জানতেই পারেনি তারা বেঁচে আছেন কি না। উদ্ধারকর্মীরা যখন একটি ছোট ড্রিল মেশিনের সাহায্যে খনির গভীরে একটি গর্ত খুঁড়তে সক্ষম হন, তখন ড্রিল বিটের সঙ্গে একটি চিরকুট উঠে আসে। সেখানে লাল কালিতে লেখা ছিল, ‘আমরা ৩৩ জন আশ্রয়কেন্দ্রে ভালো আছি।’ এই একটিমাত্র বাক্য পুরো চিলিতে উৎসবের বন্যা বইয়ে দেয়।

তবে তাদের উদ্ধার করা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিদিন একটি ছোট পাইপের মাধ্যমে তাদের খাবার, পানি, ওষুধ এবং প্রিয়জনদের চিঠি পাঠানো হতো। নিচে তাপমাত্রা ছিল প্রচণ্ড এবং আর্দ্রতায় টেকা দায় হয়ে পড়েছিল। খনি শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়েছিলেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন। দীর্ঘ ৬৯ দিন পর, পৃথিবীর নানা দেশের প্রকৌশলীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘ফিনিক্স’ নামক একটি বিশেষ ক্যাপসুল তৈরি করা হয়। প্রথম শ্রমিককে ক্যাপসুলে তুলে আনা শুরু হয় ১২ অক্টোবর গভীর রাতে (রাত ১১:৫৫ মিনিটে), তবে ৩৩ জনের সবাইকে উদ্ধার সম্পন্ন করতে পুরো ১৩ অক্টোবর পার হয়ে ১৪ অক্টোবর রাত পর্যন্ত সময় লেগেছিল (স্থানীয় সময় ১৩ অক্টোবর রাত ৯:৫৫ মিনিটে শেষ শ্রমিক ওপরে ওঠেন)।

থাম লুয়াং গুহা, থাইল্যান্ড ২০১৮

২০১৮ সালের জুন মাসে থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং ন্যাং নন গুহায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যেকোনো হলিউড থ্রিলারকেও হার মানায়। ২৩ জুন, ‘ওয়াইল্ড বোয়ার্স’ ফুটবল দলের ১২ জন কিশোর খেলোয়াড় এবং তাদের ২৫ বছর বয়সী সহকারী কোচ ফুটবল অনুশীলন শেষে গুহাটি দেখতে যান। কিন্তু হঠাৎ শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টির কারণে গুহার ভেতরের পথ পানিতে তলিয়ে যায় এবং তারা গুহার প্রায় ৪ কিলোমিটার গভীরে আটকা পড়ে।

থাইল্যান্ডের সরকার, থাই নেভি সিল এবং সারাবিশ্ব থেকে আসা বিশেষজ্ঞ গুহা-ডুবুরিদের সমন্বয়ে শুরু হয় এক বিশাল উদ্ধার অভিযান। ৯ দিন অন্ধকারে না খেয়ে থাকার পর ব্রিটিশ ডুবুরিরা তাদের একটি কর্দমাক্ত শুষ্ক প্রকোষ্ঠে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান। কিন্তু তাদের বের করে আনা ছিল এক অসম্ভব মিশন, কারণ গুহার অনেক অংশ পানিতে সম্পূর্ণ পূর্ণ ছিল এবং পথ ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। উদ্ধার চলাকালে সামান কুনান নামে থাই নেভি সিলের এক সাবেক সদস্য অক্সিজেনের অভাবে মারা যান, যা এই অভিযানের মর্মান্তিক দিকটি তুলে ধরে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, ছেলেদের হালকা চেতনানাশক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে ডুবুরিরা তাদের টেনে বের করে আনবেন। ৮ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে তিন দফায় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের মাধ্যমে ১৩ জনকেই জীবিত উদ্ধার করা হয়।

সিল্কিয়ারা টানেল ধস, ভারত ২০২৩

খুব কাছের অতীতের একটি ঘটনা হলো ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তর কাশীতে সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গধস। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর ভোরে নির্মাণাধীন এই সুড়ঙ্গের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে, যার ফলে ভেতরে আটকা পড়েন ৪১ জন নির্মাণ শ্রমিক। বাইরে আসার একমাত্র পথটি পাহাড়ের বিশাল পাথরের স্তূপে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সুড়ঙ্গের ভেতরে যদিও আলো, বাতাস এবং পর্যাপ্ত জায়গা ছিল, তবে কতদিন তারা সেখানে টিকতে পারবেন তা নিয়ে তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়।

উদ্ধার অভিযানের শুরুতে আমেরিকা থেকে আনা অত্যাধুনিক ‘অগার ড্রিলিং মেশিন’ দিয়ে ধ্বংসস্তূপ ছিদ্র করে একটি পাইপ ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর শক্ত পাথরে বাধা পেয়ে সেই বিশাল মেশিনটিও ভেঙে যায়। এরপর পুরো অভিযান এক চরম হতাশার মুখে পড়ে। অবশেষে ডাক পড়ে ভারতের ঐতিহ্যবাহী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ‘র‌্যাট-হোল’ বা ইঁদুরের গর্ত খোঁড়া খনি শ্রমিকদের। এই শ্রমিকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতুড়ি, ছেনি ও বেলচা দিয়ে ম্যানুয়ালি বাকি ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে পথ তৈরি করেন। টানা ১৭ দিনের অমানবিক লড়াই শেষে ২৮ নভেম্বর একটি বড় পাইপের ভেতর দিয়ে স্ট্রেচারে করে ৪১ জন শ্রমিককেই হাসিমুখে বের করে আনা হয়।

স্যান্ড কেভ ট্র্যাজেডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯২৫

১৯২৫ সালের ফ্লয়েড কলিন্সের ঘটনা। আমেরিকার কেন্টাকি রাজ্যের স্যান্ড কেভ নামে একটি গুহা আবিষ্কার ও পর্যটকদের জন্য তা উন্মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন অভিজ্ঞ গুহা অভিযাত্রী ফ্লয়েড কলিন্স। ৩০ জানুয়ারি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বড় পাথর খসে তার বাম পায়ের ওপর পড়ে। তিনি আটকা পড়েন ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫৫ ফুট নিচে, কিন্তু অত্যন্ত দুর্গম এক বাঁকে।

তাকে উদ্ধারের জন্য শুরু হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা দ্রুতই আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বড় মিডিয়া সার্কাসে পরিণত হয়। খবরের কাগজ ও রেডিওর সাংবাদিকরা সেখানে ভিড় জমান। প্রথম কয়েকদিন উদ্ধারকারীরা কলিন্সের কাছে পৌঁছাতে পারতেন এবং তাকে খাবার ও পানি দিতেন। কিন্তু কিছুদিন পর গুহার ওই পথটি ধসে পড়ে কলিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর উপর থেকে নতুন একটি খাদ খুঁড়ে তার কাছে পৌঁছানোর কাজ শুরু হয়। কিন্তু ১৪ দিন পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি উদ্ধারকর্মীরা যখন কলিন্সের কাছে পৌঁছান, তখন তিনি আর বেঁচে নেই। হাইপোথার্মিয়া এবং অনাহারে তার মৃত্যু হয়েছিল। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, পৌঁছানোর আনুমানিক ৩ থেকে ৪ দিন আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল (আটকা পড়ার প্রায় ১৪তম-১৫তম দিনে)। তবে সংকীর্ণ খাদের জটিলতার কারণে ১৬ ফেব্রুয়ারি তার মরদেহ বাইরে আনা সম্ভব হয়নি; তার মরদেহ গুহা থেকে বের করে আনা হয়েছিল প্রায় দু’মাস পর, ২৩ এপ্রিল ১৯২৫-এ।

রিজেনডিং গুহা, জার্মানি ২০১৪

গুহা অভিযানের ইতিহাসে ২০১৪ সালের জার্মানির রিজেনডিং গুহার উদ্ধার অভিযানকে সবচেয়ে জটিল ও ব্যয়বহুল লজিস্টিক্যাল অপারেশনগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। রিজেনডিং হলো জার্মানির আল্পস পর্বতমালার সবচেয়ে গভীর এবং দীর্ঘতম গুহা। এই গুহার অন্যতম আবিষ্কারক এবং অভিজ্ঞ স্পেলিওলজিস্ট যোহান ভেসথাউসার তার দল নিয়ে গুহার ১,১৪৮ মিটার (প্রায় ৩,৭৬৬ ফুট) গভীরে অবস্থান করছিলেন। ৮ জুন হঠাৎ উপর থেকে একটি পাথর খসে তার মাথায় পড়ে এবং তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং তিনি হাঁটতে বা নড়াচড়া করতে অক্ষম হয়ে পড়েন।

এত গভীর থেকে একজন আহত মানুষকে স্ট্রেচারে করে বের করে আনা আক্ষরিক অর্থেই এক অসম্ভব কাজ ছিল। গুহার পথ ছিল অত্যন্ত আঁকাবাঁকা, কোথাও একদম খাড়া উপরের দিকে উঠে গেছে, আবার কোথাও এতটাই সংকীর্ণ যে একজন মানুষের গলে যাওয়াই কঠিন। যোহানের এক সঙ্গী তাকে সেখানে রেখে টানা ১২ ঘণ্টা বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে গুহার বাইরে এসে খবর দেন। এরপর শুরু হয় এক বিশাল আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযান। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং ক্রোয়েশিয়া থেকে ৭০০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ গুহা উদ্ধারকারী এবং ডাক্তার এই অভিযানে যোগ দেন।

গুহার ভেতরেই যোহানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর স্ট্রেচারে বেঁধে, দড়ির সাহায্যে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে টেনে তাকে উপরে তোলার কাজ শুরু হয়।

দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৮ জুন। কিন্তু তাকে স্ট্রেচারে তুলে গুহার নিচ থেকে ভূপৃষ্ঠের দিকে টানা শুরু হয় ১৩ জুন। ১৯ জুন সকাল ১১:৪৪ মিনিটে তিনি বাইরে আসেন। অর্থাৎ গুহা থেকে তাকে টেনে তোলার সক্রিয় উদ্ধার পর্বটি চলেছিল ৬ দিন। টানা সাড়ে ১১ দিনের অমানবিক পরিশ্রমে, ১৯ জুন তাকে জীবিত অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে তুলে আনা হয়।

টেক্সাস কূপ ট্রাজেডি, আমেরিকা ১৯৮৭

খনি বা গুহা না হলেও মাটির নিচের অন্ধকার গর্তে আটকা পড়ার ঘটনা হিসেবে ১৯৮৭ সালের ‘বেবি জেসিকা’র ঘটনাটি সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৮৭ সালের ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মিডল্যান্ড শহরে জেসিকা ম্যাকক্লুর নামের ১৮ মাস বয়সী শিশু জেসিকা তার খালার পরিচালিত একটি দিবাযত্নকেন্দ্রের পেছনের উঠোনে খেলছিল। খেলতে খেলতে সে হঠাৎ একটি পরিত্যক্ত জলের কূপের ভেতরে পড়ে যায়। কূপটির ব্যাস ছিল মাত্র ৮ ইঞ্চি এবং জেসিকা ভূপৃষ্ঠ থেকে ২২ ফুট নিচে একটি বাঁকের মধ্যে আটকা পড়ে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো আমেরিকা যেন থমকে যায়। সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যমগুলো প্রথমবারের মতো টানা সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে, যা আধুনিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এটি ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ সরাসরি সম্প্রচারিত উদ্ধারের ঘটনা। উদ্ধারকারীরা সরাসরি কূপটিতে নামতে পারছিলেন না, কারণ সেটি ছিল অত্যন্ত সরু। বাধ্য হয়ে তারা কূপের সমান্তরালে একটি নতুন গর্ত খোঁড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু টেক্সাসের মাটি ছিল অত্যন্ত শক্ত পাথুরে, ফলে ড্রিলিংয়ের কাজ এগোচ্ছিল খুব ধীরগতিতে। মাটির নিচ থেকে মাঝে মাঝে শিশু জেসিকার কান্নার আওয়াজ এবং আধো আধো বোলে গান গাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যা উদ্ধারকর্মীদের আরও মরিয়া করে তোলে।

টানা ৫৮ ঘণ্টা ধরে চলা এই হার না মানা অভিযানের পর, অবশেষে ১৬ অক্টোবর উদ্ধারকর্মীরা সমান্তরাল গর্ত থেকে একটি আড়াআড়ি সুড়ঙ্গ কেটে জেসিকার কাছে পৌঁছান। সারা শরীর কাদামাখা এবং ডান পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় যখন জেসিকাকে উদ্ধার করে ওপরে আনা হয়, তখন পুরো দেশ আনন্দে কেঁদে উঠেছিল।

নিল মস ট্র্যাজেডি, যুক্তরাজ্য ১৯৫৯

মানুষের সাহসিকতা ও চেষ্টার গল্পগুলোর পাশাপাশি কিছু গল্প থাকে চরম হতাশা ও বিষাদের, যেখানে প্রকৃতির কাছে মানুষ পুরোপুরি অসহায়। ১৯৫৯ সালের ২২ মার্চ যুক্তরাজ্যের ডার্বিশায়ারের পিক ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত পিক ক্যাভার্ন কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত ‘স্পিডওয়েল ক্যাভার্ন’-এর একটি দূরবর্তী শাখা শ্যাফটে (যা পরবর্তীতে নামে পরিচিত হয়) এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০ বছর বয়সী ছাত্র এবং অপেশাদার গুহা অভিযাত্রী নীল মস একটি নতুন আবিষ্কৃত সংকীর্ণ উল্লম্ব শ্যাফট (যা একটি সরু সুড়ঙ্গের মতো) অন্বেষণ করতে নিচে নামেন। প্রায় ৪০ ফুট গভীরে নামার পর শ্যাফটের শেষ প্রান্তে গিয়ে তিনি আটকে যান। জায়গাটি এতটাই সরু ছিল যে, তিনি তার হাত-পাও নাড়াতে পারছিলেন না।

উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছান, কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। শ্যাফটের গঠনটি ছিল অনেকটা বোতলের গলার মতো, যেখানে বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল ছিল না। নিল মস আটকে থাকায় এবং উদ্ধারকর্মীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে সেখানে দ্রুত কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হতে থাকে। উদ্ধারকারীদের একজন অক্সিজেনের মাস্ক নিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন, কিন্তু সরু পথের কারণে তিনি নীলের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে নীল সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়েন। টানা দুই দিন ধরে অমানবিক চেষ্টার পরও তাকে বের করা সম্ভব হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় গুহার ভেতরেই তার মৃত্যু হয়। তার শরীরটি বের করা অসম্ভব হওয়ায়, পরবর্তীতে তার বাবার সম্মতিতে ওই শ্যাফটটিকেই পাথর ও কংক্রিট দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়। নীল মসের সমাধি হয়ে থাকে সেই অন্ধকার গুহাই।

স্বর্ণখনি ধস, অস্ট্রেলিয়া ২০০৬

২০০৬ সালের ২৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া দ্বীপের বিকনসফিল্ড শহরের একটি সোনার খনিতে ছোট মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে ভয়াবহ ধস নামে। সে সময় খনির গভীরে ১৭ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। এদের মধ্যে ১৪ জন দ্রুত নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু ল্যারি নাইট নামে এক শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং ব্রান্ট ওয়েব ও টড রাসেল নামে দুই শ্রমিক ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার (৩২০০ ফুট) নিচে আটকা পড়েন।

তারা একটি ‘টেলিহ্যান্ডলার’ মেশিনের ছোট একটি ইস্পাতের খাঁচার (বাস্কেট) ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা তাদের ওপর পড়া বিশাল পাথরগুলো থেকে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। প্রথম পাঁচ দিন তাদের মৃত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং সাউন্ড ডিটেক্টরের মাধ্যমে উদ্ধারকর্মীরা নিশ্চিত হন যে তারা বেঁচে আছেন। এরপর একটি অত্যন্ত ছোট গর্ত খুঁড়ে তাদের কাছে পানীয় জল, খাবার এবং পরিবারের চিঠি পাঠানো হয়। তাদের উদ্ধার করার জন্য শক্ত গ্রানাইট পাথর কেটে নতুন একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করতে হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত ধীর ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। দীর্ঘ ১৪ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পর ৯ মে ভোরে এই দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যা পুরো অস্ট্রেলিয়ায় জাতীয় উল্লাসের জন্ম দেয়।

এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় সবচেয়ে গভীর উদ্ধার অভিযান হিসাবে (প্রায় ৩,২০০ ফুট নিচে)।

পাহাড়ি ঢল, নেপাল ২০২৬

হিমালয়কন্যা নেপালের ভৌগোলিক কাঠামো যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি বিপজ্জনক। এখানে পাহাড় কেটে রাস্তা বা সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ সব সময়ই চরম ঝুঁকির। সম্প্রতি (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৬) নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও পাহাড়ি ঢলের ফলে ‘আপার ত্রিশূলী-১’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গে ধস নামে। ফলে লু হাইতাও নামের এক চীনা নাগরিক সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়েন। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার সমস্ত যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ বিশাল পাথরের স্তূপ আর মাটিতে এমনভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, প্রাথমিকভাবে তার বেঁচে থাকার কোনো আশাই দেখতে পাননি উদ্ধারকর্মীরা।

টানা ১০ দিন ওই সুড়ঙ্গের প্রায় ২২৫ মিটার (৭৪০ ফুট) গভীরে অন্ধকার, শীতল ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে আটকে ছিলেন সেই চীনা নাগরিক। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। নেপালি সেনাবাহিনী ও বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে দিনরাত এক করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত, ৫ সেপ্টেম্বর উদ্ধারকর্মীদের একটি দল যখন সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়, তখন তারা লু হাইতাওকে অবিশ্বাস্যভাবে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। অনাহার এবং মানসিক ট্রমার কারণে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লেও, মৃত্যুর মুখ থেকে তার এই ফেরা প্রমাণ করেছে মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির কথা। এই ঘটনাটি আধুনিক সুড়ঙ্গ নির্মাণে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

কিউক্রিক খনি, যুক্তরাষ্ট্র ২০০২

২০০২ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া রাজ্যের সমারসেট কাউন্টিতে কিউক্রিক (ছঁবপৎববশ) কয়লা খনিতে ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। খনির গভীরে কাজ করছিলেন নয়জন খনি শ্রমিক। খনন কাজ চালানোর সময় তারা ভুলবশত পাশে অবস্থিত একটি পুরোনো, পরিত্যক্ত ও জলপূর্ণ খনির দেয়াল ভেঙে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৫০ মিলিয়ন (৫ কোটি) গ্যালন বরফশীতল জল প্রচণ্ড বেগে তাদের দিকে ধেয়ে আসে। জীবন বাঁচাতে তারা খনির অপেক্ষাকৃত একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন, কিন্তু সেখানেও জল দ্রুত বাড়তে থাকে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং খনির ভেতরের তাপমাত্রা ছিল অত্যন্ত কম।

শ্রমিকরা একে অপরকে উষ্ণ রাখতে একসঙ্গে জড়াজড়ি করে বসেছিলেন। তারা এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে, শেষ পরিণতি মেনে নিয়ে প্রত্যেকে নিজেদের পরিবারের উদ্দেশ্যে বিদায়ী চিঠি লিখে রেখেছিলেন। স্রোতে ভেসে গেলে যেন সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়, সেজন্য তারা একে অপরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। এদিকে ভূপৃষ্ঠে উদ্ধারকর্মীরা হিসাব করে একটি এয়ার পকেট শনাক্ত করেন এবং সেখানে একটি ছোট গর্ত খুঁড়ে প্রচণ্ড চাপে গরম বাতাস ঢোকাতে শুরু করেন, যাতে জলের উচ্চতা আর বাড়তে না পারে।

টানা ৭৭ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর, উদ্ধারকর্মীরা একটি বড় ড্রিল মেশিনের সাহায্যে প্রাথমিক বাতাস ও যোগাযোগের জন্য ড্রিল করা ৬ ইঞ্চি চওড়া গর্তকে ২৬ থেকে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের যথেষ্ট বড় করে একটি উদ্ধারকারী হলুদ খাঁচা নিচে পাঠান। ২৮ জুলাই একে একে ৯ জন শ্রমিককেই জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ