ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ কিংবা পড়াশোনার কারণে অনেকেই রাতের ঘুমের সঙ্গে আপস করেন। ‘আরেকটু কাজ করি, ঘুম পরে হবে’ এমন অভ্যাস হয়তো শুরুতে ক্ষতিকর মনে হয় না। কিন্তু নিয়মিতভাবে ঘুমের সময় কমিয়ে দিলে শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে নানা সমস্যা। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর ওপর।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রতি রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমানোর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন ও স্ট্রোকের মতো কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার আশঙ্কাও বাড়তে পারে যেগুলো আবার হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঘুমের সময় শরীরে কী ঘটে?
ঘুমকে শুধু শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রামের সময় ভাবলে ভুল হবে। ঘুমের মধ্যেই শরীরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়। রক্তচাপ, হৃদ্স্পন্দন, হরমোনের ভারসাম্য, বিপাকীয় কার্যক্রম এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মতো প্রক্রিয়াগুলো স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় সাধারণত রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন কিছুটা কমে যায়। এটি হৃদ্যন্ত্রকে দিনের ব্যস্ততার পর বিশ্রামের সুযোগ দেয়। কিন্তু নিয়মিত ঘুম কম হলে এই স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে রক্তচাপ বাড়ার পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
কম ঘুমে যে ঝুঁকিগুলো বাড়তে পারে
নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুমের সঙ্গে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতা, দীর্ঘমেয়াদে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি। এর মধ্যে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা হৃদ্রোগের স্বতন্ত্র ঝুঁকি। অর্থাৎ, কম ঘুম শুধু সরাসরি হৃদ্যন্ত্রকে প্রভাবিত করে না; শরীরের বিপাকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমেও পরোক্ষভাবে হৃদ্রোগের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
কেন কম ঘুম হৃদ্যন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক?
এর একটি কারণ হলো স্ট্রেস হরমোনের পরিবর্তন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রদাহ। দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে শরীরে প্রদাহজনিত পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া কম ঘুম রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা, ওজন বৃদ্ধি এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুমের অনিয়ম স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। এই স্নায়ুতন্ত্র হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় কী বলছে?
ঘুম ও হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। ২০২৪ সালে আমেরিকান জার্নাল অব প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় কম ঘুমের সঙ্গে হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু, কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি এবং করোনারি আর্টারি ডিজিজের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোসায়েন্স’এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভে’এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে ঘুমের সময়কাল ও ঘুমের ব্যাঘাতসহ বিভিন্ন ঘুম-সম্পর্কিত বিষয়ের সঙ্গে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
বেশিরভাগ স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে শুধু ঘুমের সময়ই নয়, ঘুমের মান এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন গভীর রাতে ঘুমানো, বিভিন্ন দিনে ঘুমের সময় ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করা কিংবা নিয়মিত ঘুম ভেঙে যাওয়া এসব অভ্যাসও শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রকে ব্যাহত করতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে ঘুমের অভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ঘুমকে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মতোই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা, রাতে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলা, সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমানো এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা উপকারী হতে পারে। আর যদি নিয়মিত ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসা বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কাজের সময় বাড়াতে ঘুম কমানো হয়তো সাময়িকভাবে সময় বাঁচাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হতে পারে শরীরকে। তাই ভালো কর্মক্ষমতার পাশাপাশি সুস্থ হৃদ্যন্ত্রের জন্যও পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।