শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি ও বিভিন্ন ধরনের ছুটিসহ শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর বেশ কয়েকটি ধারা থেকে নতুন করে অব্যাহতি চেয়েছে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ। কোম্পানিটির এ আবেদনে উদ্বেগ জানিয়েছে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জনস্বার্থে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এ ধরনের অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই।
শ্রম আইন অনুযায়ী, দৈনিক কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, রাতের পালায় কাজ, নারী শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের কর্মঘণ্টার নোটিশ, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক বন্ধ, বেতনসহ বার্ষিক ছুটি এবং উৎসবের ছুটিসংক্রান্ত ধারা থেকে অব্যাহতি চেয়েছে কোম্পানিটি।
কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) মহাপরিদর্শক মো. ফরহাদ সিদ্দিকী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শেভরন আরও কিছু বিষয়ে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছে। বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী আবেদনটি পর্যালোচনা করা হবে।
শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রম আইন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা জনস্বার্থে বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সাময়িক মেলার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের ছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে। শেভরনের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি প্রযোজ্য নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, কর্মঘণ্টা ও ছুটি শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার। জনস্বার্থে প্রয়োজন না হলে এসব অধিকার খর্ব করা উচিত নয়। তিনি শেভরনের আবেদন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান।
এদিকে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তফা সুহেল ইকবাল বলেন, অব্যাহতির আবেদনের বিষয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সরকার তাদের মতামত চাইলে বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন তারা।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের পক্ষে আলোচনা ও দরকষাকষির ক্ষেত্রে আমরাই সংশ্লিষ্ট পক্ষ। কিন্তু আমাদের না জানিয়ে শ্রমিকদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা আমরা জানি না। ছুটি শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার। শ্রম আইনে ছুটি ও এর ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। শেভরন শ্রমিকদের জন্য কী পরিকল্পনা করছে, সেটিও আমাদের জানানো হয়নি।’
ডিআইএফই মহাপরিদর্শকের কাছে দেওয়া চিঠিতে ইউনিয়নটি বলেছে, সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক ছুটি ও উৎসবের ছুটিসহ ছুটিসংক্রান্ত বিধানগুলো শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য করা হয়েছে। শ্রম আইন ও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অব্যাহতি দেওয়া হলে শ্রমিকদের অধিকার ও চাকরির শর্ত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইউনিয়নের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করার দাবি জানিয়েছে তারা।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শ্রম আইনের বেশ কয়েকটি বিধান থেকে শেভরনকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগে এ ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
সর্বশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শেভরনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোম্পানিটির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে শেভরনের নতুন আবেদনের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শ্রম বিধিমালায় সংশোধন এনে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ও অংশগ্রহণমূলক মুনাফা তহবিলে (ডব্লিউপিপিএফ) বাধ্যতামূলক অবদানের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি এ সংশোধনের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে শেভরন সবচেয়ে বড় কোম্পানি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫৮ শতাংশ আসে শেভরনের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে। অন্যদিকে টাল্লোর অবদান প্রায় ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক মুনাফা তহবিলে দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে ২০১৩ সালের সংশোধনের মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতকে এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন গত ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মুনাফা ভাগাভাগির বিধান নিয়ে সরকার চাপের মুখে পড়েছিল। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা ও নানা যুক্তি উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগ না করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
শ্রম অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গতিও এ ঘটনায় আলোচনায় এসেছে। ২০১৩ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধসের পর শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশকে দেওয়া বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার ও উচ্চতর শ্রমমান উন্নয়নে সরকারি পর্যায়ে নীতি গ্রহণ করে ওয়াশিংটন। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতেও শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার সুরক্ষা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়ন জোরদারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।