মিস শম্পা (ছদ্মনাম) একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি প্রতিদিন সকালে ঘর ছেড়ে যখন কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন। তখন কেবল অফিস ব্যাগ নিয়ে যান না তার সঙ্গে থাকে এক বুক স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা আর পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব। আমরা তাকে দেখি কর্মজীবী বা অর্থনৈতিকভাবে ‘স্বাবলম্বী নারী’ হিসেবে। কখনো নারীর ক্ষমতায়নের পরিসংখ্যানে তাকে একটি সংখ্যা বানিয়ে ফেলি। কিন্তু কমই ভাবি, নারীটি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে আছেন তো? সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তাদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একজন নারী সহকর্মীকে নিয়ে অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা ও দায় নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশে একজন নারীকে যদি মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়, তখন এটি কেবল প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং তা সামগ্রিক কর্মপরিবেশের সংস্কৃতি, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন জন্ম দেয়।
কর্মক্ষেত্রে নারীকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি, অবমাননাকর মন্তব্য, অশালীন রসিকতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন ঘটনা নয়। নতুন বিষয় হলো, এসব ঘটনার কিছু কিছু এখন ডিজিটাল মাধ্যমে চলে আসছে। অফিসের কাজ শুধু চার দেয়ালের মধ্যে হয় না। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ই-মেইল, মেসেঞ্জার, অনলাইন মিটিং, অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইত্যাদি কর্মসম্পর্কের অংশ। অফিসের কোনো ডিজিটাল গ্রুপে একজন নারীকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন রসিকতা কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণœ করে- এমন আলোচনা ‘অফিসের বাইরের বিষয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল হয়রানির সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, এর ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব। একটি ‘অশালীন মন্তব্য’ কয়েক সেকেন্ডে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা মুছে ফেলা অসম্ভব।
বেশিরভাগ নারী ভয়, অসহায়ত্ব এবং কর্ম প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থার কারণে হয়রানির শিকার হয়ে চুপ থাকেন। তখন নারী হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন আশঙ্কার মুখোমুখি হন। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হন, তাহলে অভিযোগ করলে তার চাকরির কী হবে? যদি সহকর্মীরা যদি তাকে ‘সমস্যা তৈরি করা মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, ঘটনাকে ‘মজা’ বলে উড়িয়ে দেন? কিংবা যদি কর্মস্থলে পদোন্নতির বিষয় বা সহকর্মীদের সঙ্গে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়? এই ভয়গুলো কিন্তু কাল্পনিক নয়। ফলে কোনো নারী অভিযোগ না করলে ধরে নিতে হবে, তার নীরবতার জন্য কর্মপরিবেশ কোনো না কোনোভাবে দায়ী। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে যদিও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এর বিধিমালা-২৭(ক) তে বিশেষভাবে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলায়, হাইকোর্টের রিট পিটিশন ৫৯৩৯/২০০৮-এর নির্দেশনা মোতাবেক কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনায় যৌন হয়রানির পরিসরের মধ্যে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মৌখিক বক্তব্য, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি, যৌন অর্থবোধক কৌতুক বা অপমানজনক ভাষা, ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ হয়রানি, এমনকি যৌন উদ্দেশ্যে ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল বা চরিত্র হননের মতো আচরণও অন্তর্ভুক্ত।
চাকরি পাওয়ার পর যদি একজন নারীকে অপমান সহ্য করতে হয় বা ভয়ের মধ্যে কাজ করতে হয়, কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কায় থাকতে হয় তবে সেই ক্ষমতায়ন অসম্পূর্ণ। একজন নারী প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে যেন ভাবতে বাধ্য না হন, আজ আবার কে কী বলবে? অফিসের কোনো গ্রুপে নিজের নাম দেখলে যেন মনে আতঙ্ক তৈরি না হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আগে যেন নিজের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব করতে না হয়। এটাই সভ্য কর্মপরিবেশের ন্যূনতম দাবি। আর সভ্য কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে অবিলম্বে করণীয় ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমত, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন ও কার্যকর অভিযোগ কমিটি থাকতে হবে। তবে কমিটি থাকা যথেষ্ট নয়; তার স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের প্রক্রিয়া সহজ, নিরাপদ ও গোপনীয় করতে হবে। অভিযোগকারীকে কোনোভাবেই প্রতিশোধ, হয়রানি বা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কায় রাখা যাবে না। তৃতীয়ত, তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা
একজন নারী কর্মস্থলে কারও অনুগ্রহ চাইতে কখনো প্রবেশ করেন না। বরং শ্রম, মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি নিয়ে, কাজ করার অধিকার নিয়ে প্রবেশ করেন। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা বা দয়া প্রদর্শন নয় এটি তার মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা শুধু প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়ও বটে। বাংলাদেশ এখন কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করার পথে এগোচ্ছে। তখন আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে কর্মসংস্কৃতিকে বদলে দেওয়ার। কারণ নিরাপদ কর্মক্ষেত্র কেবল নারীর জন্য নিরাপদ একটি জায়গা নয়; এটি একটি সভ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম পরিচয়। সেই পরিচয় অর্জনের পরীক্ষায় আমাদের এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই পথচলা শুরু হোক এখনই।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক