শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন

ঢাকায় সন্ত্রাসে বহিরাগত শুটার

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার

ভয়ংকর অস্ত্রবাজ বা শুটার, ভাড়াটে কিলার থেকে শুরু করে যে কোনো ধরনের অপরাধী— এলাকাভিত্তিক সবার তালিকা থাকে পুলিশের কাছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক কিছু ভয়ংকর অপরাধের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পুলিশের। টার্গেট কিলিংয়ে ঢাকার বাইরে থেকে আসছে শুটার! পুলিশের তালিকায় নতুন এই অস্ত্রবাজদের নাম না থাকায় বেগ পেতে হচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনতেও। পুলিশ সূত্রে মিলেছে এসব তথ্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীতে ফের সরব হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তারা টার্গেট কিলিং বা ভয় দেখাতে গুলি ছুড়লেও সেই কাজে এসেছে নতুন মুখ। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে শুটারদের ভাড়া করে এনে অপরাধ মিশন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত-দলীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড ও গোলাগুলির ঘটনা।

পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ভাড়াটে খুনিরা ফরমায়েশ পেয়ে ঢাকায় এসে টার্গেটের ওপর রেকি চালায়, পরে সুযোগ বুঝে হামলা করে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এ কারণে তাদের সম্পর্কে আগাম কোনো তথ্য থাকে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। ফলে অপরাধ ঠেকানো যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি হামলার পর সরাসরি জড়িত শুটারদের শনাক্ত করতেও বেগ পেতে হচ্ছে তদন্তকারীদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও ক্রাইম বিভাগের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, রাজধানীর স্থানীয় সন্ত্রাসী ও শুটারদের একটি বড় অংশ তাদের নজরদারির আওতায় রয়েছে। কিন্তু কিলিংয়ের ক্ষেত্রে জেলা শহর বা সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভাড়া করে আনা হচ্ছে অস্ত্রধারীদের। তাদের পরিচয় আগে থেকে জানা নেই এবং পুলিশের তালিকাতেও নাম নেই। সোর্সও তাদের সম্পর্কে জানে না। এতে ঘটনার আগে তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ঘটনার পরও অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে সময় লেগে যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ওসমান গণি কালবেলাকে বলেন, ‘রাজধানীতে গত কয়েকটি ঘটনায় ঢাকার বাইরের শুটারদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের আমরা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। আমরা কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার ভেতরের হোক আর বাইরের হোক, এসব শুটারকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবেই। অবশ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীতে পেশাদার অস্ত্রধারী, শুটার বা খুনিদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে শুধু পুরোনো তালিকা দিয়ে কাজ হবে না। বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, আন্তঃজেলা অপরাধী ডাটাবেস সমৃদ্ধ করা এবং নতুন সক্রিয় শুটারদের দ্রুত শনাক্ত করে নজরদারিতে আনতে হবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুটার এবং ভাড়াটে খুনিদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছিল। ওই সময় ৪০১ জন শুটার ও ভাড়াটে খুনির নাম তালিকাভুক্ত হয়। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সামনে আসায় ফের তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া ও পলাতক অপরাধীদের তথ্য যুক্ত করা হচ্ছে তালিকায়।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও বাইরে থেকে আসা শুটারদের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকায় কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় শুটাররা। এতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হামলায় যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন এবং আহত হন আরও দুজন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ চঞ্চল নামে একজনকে আটক করার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, বাবুকে হত্যার জন্য ঝিনাইদহ থেকে চারজন ভাড়াটে শুটারকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। তারা কয়েকদিন ধরে এলাকায় অবস্থান করে রেকি চালানোর পর হামলা চালায়।

ওই হত্যাকাণ্ডে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ঝিনাইদহ থেকে আসা চার শুটারের মধ্যে চঞ্চল মোল্লা নামে একজনকে ঘটনার সময় স্থানীয় জনতা আটক করে। এতেই মূলত দ্রুত ওই ঘটনার জট খোলে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা ৪ শুটারসহ ওই হত্যাকাণ্ডে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

এর আগে গত ২৮ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় মামলা করা হলেও রনি ওরফে ভাঙাড়ি রনি নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়; কিন্তু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া শুটারদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, গুলিবর্ষণকারীরা ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিল। এজন্য নানাভাবে তদন্ত করেও তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম খুনিদের শনাক্তে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগে ভাড়াটে খুনিদের একটি বড় অংশ রাজধানীর পরিচিত অপরাধীচক্র থেকেই আসত। কোন এলাকায় খুন হয়েছে বা গুলি হয়েছে—সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার সোর্স কাজে লাগিয়ে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হতো; কিন্তু এখন অপরাধীদের পরিকল্পনা বদলেছে। মূল পরিকল্পনাকারীরা নিজেদের পরিচিত শুটার ব্যবহার না করে বিভিন্ন জেলা থেকে অস্ত্রধারীদের ভাড়া করছে। এতে স্থানীয় সোর্স নেটওয়ার্ক কিংবা গোয়েন্দা নজরদারিতে তাদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করায় সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় করেও অনেক সময় সরাসরি হামলাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাতে থাকা তালিকায় ১০৬ জন শুটার ও পেশাদার খুনি রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগ এলাকায়। এরপর ওয়ারী বিভাগে ৭৩ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৬১ জন, মিরপুর বিভাগে ৬০ জন, রমনা বিভাগে ৩৬ জন, লালবাগ বিভাগে ২৪ জন, গুলশান বিভাগে ১৬ জন এবং উত্তরা বিভাগে ১৩ জন রয়েছে। এরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর আশীর্বাদপুষ্ট বা তাদের গ্রুপের সদস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘পরিকল্পিত যে কোনো হত্যাকাণ্ড এমনভাবে ঘটানো হয়, যেন হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্তদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়। ঢাকায় বাইরে থেকে আসা শুটারদের শনাক্ত করাও পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেক্ষেত্রে শুধু ঢাকার ভেতরে নয়, দেশের সব অপরাধীর একটি তালিকা করা উচিত।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ