বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা শিক্ষার্থী বিক্ষোভে দিল্লির ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ আগামীকালই পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২৭ জুলাই আগামীর বাংলাদেশে যেন কোনো গ্রামবাসী চিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারায়: ডা. জুবাইদা বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে ধর্ষণ, চট্টগ্রাম এনসিপির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান হত্যা মামলা : মোজাফফরকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ, জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে ট্রিলিয়ন ডলারের: প্রধানমন্ত্রী আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ভ্রমণে ৮ নির্দেশনা

কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে ৮০০ কোটি টাকার কাজ!

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার

বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্পে ধারাবাহিক ব্যর্থতায় চুক্তি বাতিল; এমনকি কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে ফের আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পাওয়ার গ্রিড)। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণ করা একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) নীতিগত সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মাধ্যমে ফের টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর কার্যাদেশ বাতিল প্রতিষ্ঠানকে ফের টেন্ডার করে কাজ দেওয়া নজিরবিহীন।

তথ্য বলছে, প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্যমান ১১৮ টাকা হিসাবে প্যাকেজ-২-এর ৫১ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৬১২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্যাকেজ-৩-এর ১৬ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলারের মূল্য দাঁড়ায় বাংলাদেশি টাকায় ২০০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে দুটি প্যাকেজ মিলে এই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮০০ কোটি টাকার বেশি। নতুন করে এই দুটি প্রকল্পের কার্যাদেশ কালো তালিকাভুক্ত এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ট্রান্সমিশন স্ট্রেংদেনিং অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন অব রিনিউয়েবল এনার্জি প্রজেক্ট (পিটিএসআইআরইপি)’-এর কয়েকটি আন্তর্জাতিক দরপত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে এনার্জিপ্যাককে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সঙ্গে পাওয়ার গ্রিডের পূর্ববর্তী কয়েকটি চুক্তি বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং পুনঃদর প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণের বৈধতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছিল এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব এবং চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পালনে ব্যর্থতার কারণে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির তিনটি চুক্তি বাতিল করা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা আরও চারটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত বা আংশিক বাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রকল্পে শুরুর পর থেকে একাধিকবার ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।

চুক্তি বাতিল করে এনার্জি প্যাকে পাঠানো পাওয়ার গ্রিডের একটি চিঠিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক চুক্তিগত ব্যত্যয়ের অভিযোগ তোলে। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রিম অর্থ প্রদানের গ্যারান্টি জমা না দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার অংশগ্রহণে ব্যর্থতা, প্রয়োজনীয় বীমা সম্পন্ন না করা, একাধিক সাব-স্টেশনের নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকা, কাজ বন্ধ রাখা এবং নোটিশের পরও কাজ ফের শুরু না করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। এসব কারণ দেখিয়ে ‘জেনারেল কন্ডিশন অব কন্ট্রাক্টের’ আওতায় চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, পাওয়ার গ্রিডের পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণীর একটি অনুলিপিতে দেখা যায়, কোনো ঠিকাদারের ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল হলে তাকে পরবর্তী তিন বছর প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারে অংশগ্রহণের অযোগ্য করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনার্জিপ্যাকেরও অন্তত তিন বছর দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। সে হিসাবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত পাওয়ার গ্রিডে নিষিদ্ধ থাকার কথা প্রতিষ্ঠানটির।

নথিপত্র বলছে, পরে একই প্রকল্পগুলো ফের দরপত্রের আওতায় আনা হলে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এনার্জিপ্যাক আবারও দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। শুধু অংশগ্রহণই নয়, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নেও প্রতিষ্ঠানটিকে ‘রেসপনসিভ’ (পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণযোগ্য) ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটিসহ অন্তত দুটি প্রকল্প একই প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।

চিঠিপত্র, বোর্ডের কার্যবিবরণী, টেন্ডার নথি ও অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে আলোচিত প্রকল্পটি এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন গ্রিড সাব-স্টেশন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পের প্যাকেজ-২-এর আওতায় মাধবপুর ও মনোহরদীতে নতুন ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি সাব-স্টেশন নির্মাণ, বৈজুপুর সাব-স্টেশনের সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট ২৩০ ও ১৩২ কেভি লাইন নির্মাণের কথা রয়েছে।

টেন্ডার নথি অনুযায়ী, পুরো কাজটি টার্নকি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার কথা এবং ঠিকাদারকেই নকশা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্যও কঠোর কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে একই ধরনের অন্তত তিনটি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা, নির্দিষ্ট আর্থিক সক্ষমতা এবং উচ্চ ভোল্টেজের সাব-স্টেশন নির্মাণে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চীনা কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল ম্যাশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পাওয়ার গ্রিডের পরিচালনা পর্ষদ যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটির উদ্দেশ্য ছিল অযোগ্য ঠিকাদারদের ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পে অংশগ্রহণ ঠেকানো। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বরং যৌথ উদ্যোগের কাঠামো ব্যবহার করে একই প্রতিষ্ঠানকে আবারও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা কেএফডব্লিউসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব বা ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে তা সরকারি অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যা আছে চুক্তি বাতিলের চিঠিতে: চুক্তির বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি প্রকল্প চুক্তি বাতিল করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। ২০২৪ সালের ২৭ মে থেকে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৩ জুন পিজিসিবি ও এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। জেনারেল কন্ডিশন অব কন্ট্রাক্ট (জিসিসি)-এর ধারা ১৩.২.১ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রিম অর্থ প্রদানের গ্যারান্টি (এপিজি) জমা দেওয়া হয়নি। পরে গ্যারান্টি জমা দিলেও অগ্রিম অর্থের বৈদেশিক মুদ্রার অংশগ্রহণে ব্যর্থ হয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। পিজিসিবি প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানালে ছয় মাস পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। চুক্তির পরিশিষ্ট-৩ অনুযায়ী বীমা সম্পন্ন করতেও ব্যর্থ হয় কনসোর্টিয়াম।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জেনারেল কন্ডিশন অব কন্ট্রাক্টের ৪২.২.২ ধারা অনুযায়ী ‘কন্ট্রাক্টরস ডিফল্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে ২০২৪ সালের ২৭ মে থেকে চুক্তি বাতিল করা হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম বন্ধ করা এবং পিজিসিবির সরবরাহ করা সব সম্পদ ও সরঞ্জাম ফেরত দেওয়ার জন্যও কনসোর্টিয়ামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সম্পন্ন করা আংশিক ভূমি ভরাট কাজ পরিমাপ করে প্রাপ্য বিল অথবা অগ্রিম অর্থের সমন্বয়ের বিষয়টি পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান এনার্জিপ্যাককে কালো তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করে কালবেলাকে বলেন, ‘দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে আমাদের তাদের নির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ করতে হয়, যার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা তাদের অনুরোধ করেছিলাম, যারা আগে টার্মিনেট হয়েছে তাদের বাদ দেওয়ার কোনো ক্লজ রাখা যায় কি না। তারা জানিয়েছে, তাদের গাইডলাইনে এমন কোনো নিয়ম নেই।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ