যুক্তরাজ্যে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণা করা হলে তা অপ্রয়োজনীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বার্নহ্যাম বলেন, ‘আমি এখনো সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত করছি। খুব শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাব এবং সোমবার সেগুলো ঘোষণা করব।’
এরই মধ্যে নতুন অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) হিসেবে র্যাচেল রিভসের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এবং বিচারমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
লন্ডনের ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি) সদর দপ্তরে লেবার নেতা হিসেবে প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম বলেন, তার মন্ত্রিসভায় দলের সব অংশ এবং দেশের সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত শ্রমজীবী মানুষের কাছে তার সরকার নতুন আশা ফিরিয়ে আনবে। পাশাপাশি ওয়েস্টমিনস্টারকেন্দ্রিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন অঞ্চলের হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এ সময়ে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেন বার্নহ্যাম। তিনি গত ৪০ বছরের নিওলিবারেল অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেন এবং দেশে পুনঃশিল্পায়নের (রি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন) পরিকল্পনার কথা জানান।
দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নয়, বরং ‘এক লেবার দল’ হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, ‘আমরা যদি নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকি, তাহলে ব্রিটেনের নতুন ডানপন্থী শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না।’
বার্নহ্যাম জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে ইংল্যান্ডের সামাজিক সেবা (সোশ্যাল কেয়ার) ব্যবস্থার সংস্কার। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই খাতে বড় ধরনের রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর মতো সামাজিক সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যয়ের কারণে মানুষকে নিজের বাড়িঘর পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘এই অবস্থায় সামাজিক সেবা ব্যবস্থা ফেলে রাখা যায় না। বছরের পর বছর ওয়েস্টমিনস্টার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে পিছিয়ে এসেছে।’
এদিকে বিরোধী শিবির রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজ দাবি করেছেন, বার্নহ্যামের কোনো জনসমর্থনের ম্যান্ডেট নেই। তাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অবিলম্বে একটি সাধারণ নির্বাচন হওয়া উচিত।
অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি বার্নহ্যামের সহযোগিতামূলক রাজনীতির আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তার দলের দরজা আলোচনার জন্য খোলা রয়েছে। তিনি বিশেষ করে পানি খাতের সংস্কার, এনএইচএসকে আরও সহায়তা এবং পারিবারিক পরিচর্যাকারীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান কেভিন হলিনরেক দাবি করেছেন, বার্নহ্যামের উচিত সংসদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ ভেঙে এমপিদের সামনে তার সরকারের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করা।
মাত্র এক মাস আগে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সংসদে ফেরেন বার্নহ্যাম। এরপর লেবারের ৩৭৯ জন এমপি এবং দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১১টি ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থন পেয়ে তিনি একমাত্র নেতৃত্বপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
গত প্রায় ১৮ মাস ধরে বিভিন্ন জনমত জরিপে রিফর্ম ইউকের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে লেবার পার্টি। দলের নেতারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বার্নহ্যামের নেতৃত্ব দলটির জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
এর আগে জুন মাসে স্যার কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় ধরনের ভরাডুবি এবং মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বার্নহ্যামের জয়ের পর দলের ভেতর থেকেই স্টারমারের ওপর নেতৃত্ব ছাড়ার চাপ বাড়তে থাকে।