মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা সামনে রেখে আবার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই প্রায় ১৫ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১৫টি দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড-ডিপিএম) আমদানির অনুমোদন দিতে আজ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ১৫টি পৃথক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশের বড় পরিসরে জ্বালানি সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিলে একই পদ্ধতিতে অনুমোদন পাওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে না পারায় বা প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় তেল সরবরাহ করতে পারেনি। এরপরও রাজনৈতিক তদবিরে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সরকারের সরাসরি ক্রয়নীতির স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে আবার জ¦ালানি তেলের সংকট হতে পারে এমন বিবেচনায় সরাসরি ১৫টি কোম্পানিকে জ¦ালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে তেল আমদানির জন্য ১৫টি কোম্পানিকে অনুমোদন দিতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন চাওয়া
হচ্ছে। আজকে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে জ¦ালানি বিভাগের প্রস্তাব তুলে ধরা হবে। জানা গেছে, ১৫টি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে খোলা দরপত্র প্রক্রিয়া বা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বা ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম)-এ ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা জ¦ালানি বিশেষজ্ঞদের মতে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় জ¦ালানি তেল আমদানিতে দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অভিজ্ঞতা ছাড়া একাধিক কোম্পানিকে জ¦ালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ¦ালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে তদবির রয়েছে। ফলে অনেকের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে তাদের বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কর্মকর্তা বলেন, তবে ১৫টি কোম্পানিকে অনুমোদন দিলেই যে তারা আমদানি করতে পারবেন বিষয়টি তা নয়। এর আগেও ১২ কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি কোম্পানি ছাড়া কেউ তেল দিতে পারেনি। অনেকে সরকারের নির্ধারিত পিজি বা পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকাও জমা দিতে পারেনি। এ কর্মকর্তা বলেন, বিপিসি নিয়মিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখছে। তবে যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, ফলে আমাদের বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে হবে জ¦ালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে।
জ¦ালানি বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে নীতিগত অনুমোদনের জন্য ১৫টি পৃথক প্রস্তাব আজ বুধবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ উত্থাপন করবে।
সভার কার্যসূচি অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইন-৫৯০ (১০ পিপিএম) অতিনিম্ন সালফারযুক্ত ডিজেল এবং ৫০ পিপিএম ডিজেল আমদানার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে একেএ এনার্জি লিমিটেড নামক একটি কোম্পানি থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টন ইএন-৫৯০ ডিজেল আমদানির প্রস্তাব সবচেয়ে বড়। এ ছাড়া ‘এনার্জি মাল্টিনেক্স কনভারনেস টেকনোলজি এলএলসি থেকে ৫০ হাজার টন এবং বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ লাখ টন করে ডিজেল আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত আমদানির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৪ লাখ ৭৫ হাজার টন।
প্রস্তাবিত অন্যান্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্যাসিফিক সিলভারলাইন লিমিটেড, টোটাল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, সিটি জামান ইন্টারন্যাশলাল পিটিই লিমিটেড, এইটটিন সলিউশন এসডিএন ডট বিএইচডি, ইম্পোর্টেসিওনেস ব্রাভো গ্রুপ চিলি এসপিএ, রয়েল বাবজি ফুয়েল ট্রেডিং এলএলসি, সিনোপ্রাউড ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন লিমিটেড, হেলথ আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেড, কুমারানগাজী ওয়েল ফিল্ড (কেওএফ), এইচটুও পেট্রো-ক্যাম ইন্টারন্যাশানল পিটিই লিমিটেড, এইচটুও কনস্ট্রাকশন পিটিই লিমিটেড, ব্ল্যাক সোয়ান গ্লোবাল এফজেডসিও গ্যাস ওকেরিয়েল করপোরেশন।
সরকারি সূত্র বলছে, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও সংঘাতের শুরুতে কিছু নিয়মিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্স মাজুউর ঘোষণা বা সরবরাহে বিলম্ব করেছিল, বর্তমানে তারা আবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে সরবরাহ শুরু করেছে। ফলে চলতি বছরের এপ্রিলের শুরু থেকে জ্বালানি আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বাংলাদেশের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১২ হাজার ৫০০ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। বছরে এর মোট চাহিদা ৫৫ থেকে ৫৬ লাখ টন। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বাজারজাত করে, তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ডিজেল।
বর্তমানে বাংলাদেশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মূলত সৌদি আরামকো এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি) থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড, এমিরেটস ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানি সিঙ্গাপুর, পেট্রো-চায়না সিঙ্গাপুর, পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো, ইউনিপেক সিঙ্গাপুর, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেও কিছু পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করা হয়।
সরকারি একাধিক সূত্র জানায়, ইরান-সংকটের শুরুর দিকে একই ধরনের জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েকটি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের বড় পরিসরে জ্বালানি সরবরাহের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি।
বর্তমান সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের জ্বালানি সরবরাহে অংশ নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের বছরে অন্তত ৫০ লাখ টন জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা এবং চুক্তিমূল্যের অন্তত ৫ শতাংশ সমপরিমাণ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি প্রদানের সক্ষমতা থাকতে হয়।
জ্বালানি খাতের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া বড় অঙ্কের আমদানির সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, নানা রাজনৈতিক চাপে যদি অনভিজ্ঞ এবং অদক্ষ কোনো কোম্পানিকে জ¦ালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয় এবং ওই কোম্পানির ওপর নির্ভর করে তাহলে জ¦ালানি তেলের সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ যুদ্ধাকালীন নতুন অনভিজ্ঞ কোম্পানি তেল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হতে পারে। তিনি জানান, জ্বালানি আমদানির অর্থায়নের জন্য বিপিসি সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অর্থ যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি কিনতেই ব্যবহার করা উচিত বলে তিনি মত দেন।
প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে ইসরাইল ও মার্কিন আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশে জ¦ালানি তেল আমদানিতে সংকট শুরু হয়। বিপিসি বছরওয়ারী জ¦ালানি তেল আমদানির যে ক্যালেন্ডার ঠিক করে সেগুলো উলটপালট হয়ে যায়। বিপিসির তালিকাভুক্ত কোনো কোনো সরবরাহকারী যুদ্ধের মধ্যেও জ¦ালানি তেল দিতে পারবে সম্মতি দিলেও অনেকে যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেল সরবরাহে অসম্মতি প্রকাশ করে। ফলে সরকারের বছরওয়ারী জ¦ালানি তেল সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন উৎস থেকে জ¦ালানি তেল আমদানির চেষ্টা করতে থাকে বিপিসি। ফলে জ¦ালানি তেল সরবরাহের আগ্রহী বিভিন্ন ঠিকাদারদের কাছ থেকে আগ্রহপত্র সংগ্রহ করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তাদের আমদানির অনুমোদন দেয়। গত মে-এপ্রিলে অনুমোদন পাওয়া সবাই সরবরাহ করতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বিপিসির শর্ত অনুযায়ী ওই সময় অন্তত ৯ সরবরাহকারী কোম্পানি অনুমোদন পেলেও ব্যাংক জামানত বা ব্যাংক নিরাপত্তা জমা দিতে পারেনি।
জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের আগ্রহের বিষয়টি অনুবাধন করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি জ¦ালানি তেল সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করে। সরকারের বিভিন্ন জায়গা থেকে জ¦ালানি তেল সরবরাহে বিভিন্ন কোম্পানিকে সুযোগ দিতে জ¦ালানি বিভাগে তদবিরও করা হয়। ফলে সরকার বিভিন্ন আগ্রহী কোম্পানির কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করে নিয়ম অনুযায়ী তথ্য যাচাই-বাছাই করে জ¦ালানি তেল সরবরাহ দিতে অনুমোদন দেয়। সরকার একাধিক কোম্পানির প্রস্তাব সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অনুমোদন নিশ্চিত করে। তবে বাস্তবতা হলো সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অনুমোদন পেলেও অনেক কোম্পানি জ¦ালানি তেল সরবরাহের নিয়ম অনুযায়ী বিপিসিকে পারফরমেন্স গ্যারান্টি বা ব্যাংক নিরাপত্তা জামানতের টাকাই (পিজি) সরবরাহ করতে পারেনি। জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই সময় কমপক্ষে ১২টি কোম্পানিকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন জ¦ালানি তেল সরবরাহের অনুমোদন দিলেও একটি কোম্পানি পিজি জমা দেয়। বাকিরা পিজিই জমা দিতে পারেনি।