বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

ঐতিহাসিক বিজয় দাবি ইরানের

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার

আর মাত্র ৯০ মিনিট বাকি ছিল। না হলে নাকি সভ্যতাপ্রাচীন ইরানি জনপদ ও জাতিকে সমূলে ধ্বংস করে দিতেন মার্কিন যুদ্ধবাজ নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর এবং ইরানের আকাশে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার জেরে তিনি যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে লেজ গুটিয়ে পালানোর পথ খুঁজছিলেন। শেষে অদম্য ইরানকে শিরদাঁড়া খাড়া করে সমুচিত জবাবে প্রস্তুত থাকতে দেখে এশীয় মিত্র ইসলামাবাদকে দিয়ে যুদ্ধে ১৪ দিনের অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়ে এতে রাজি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর মধ্য দিয়ে ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞের পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে দেখা দিয়েছে যুদ্ধবিরতির ‘ক্ষণস্থায়ী রোদ্দুর’। তেহরান এই যুদ্ধবিরতিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, কারণ তাদের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবই এখন স্থায়ী শান্তির মূল রূপরেখা হতে যাচ্ছে; আগামীকাল এ নিয়ে ইসলামাবাদে বৈঠক বসবে। রাশিয়ার ভাষায়, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘চরম ব্যর্থ’ হয়েছে। তবু ট্রাম্প এবং তার অনুসারী প্রশাসনও এই যুদ্ধে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দাবি করেছে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের মাত্রা এত বেশি, দুই পক্ষই বলছে, অন্যথা দেখলে আবার আক্রমণ শুরু হবে এবং তাদের ‘আঙুল ট্রিগারেই আছে’। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে প্রথম দিনেই। যেমনÑ চুক্তিতে লেবাননকে যুক্ত করা হয়নি বলে দাবি করে ইসরায়েল সেখানে গতকালও হামলা চালিয়েছে, এতে কয়েকশ নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ নিহত হয়েছেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে নিজের পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেরহান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি, নতুন সর্বোচ্চ নেতা, খামেনিপুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাত করে যাচ্ছে তারা।

এই যুদ্ধে এরই মধ্যে অন্তত ৩,৭৫৬ জন নিহত হয়েছেন বলে গতকাল আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ইরানে ২,০৭৬ জন, লেবাননে ১,৪৯৭ জন, ইরাকে ১০৯ জন ও ইসরায়েলে ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন; নিহত হয়েছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্তত ১৩ জন সদস্য।

ইরানের সংগ্রাম ও সাহসিকতা : যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল। এতে বলা হয়েছে, ‘ইরানি জাতির বিরুদ্ধে চালানো কাপুরুষোচিত, বেআইনি ও অপরাধমূলক যুদ্ধে শত্রু

এক অনস্বীকার্য, ঐতিহাসিক ও চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পবিত্র রক্তের বিনিময়ে; ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক পরম শ্রদ্ধেয় আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির বিচক্ষণ পদক্ষেপে এবং রণাঙ্গনে ইসলামের বীর যোদ্ধাদের সংগ্রাম ও

সাহসিকতায়Ñ সর্বোপরি যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিন থেকেই আপনারা, এই প্রিয় দেশবাসী, যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে বীরের মতো মাঠে ছিলেনÑ তারই ফলস্বরূপ ইরান এক বিশাল ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে এবং অপরাধী আমেরিকাকে তার ১০ দফা পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করেছে।’

ব্যর্থ হলেও বিজয় দাবি ট্রাম্পের : ট্রাম্প বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, বিশ্ব শান্তির পক্ষে এ এক মহা সুসংবাদ। ইরান এটা চেয়েছে, তারাও আর অশান্তি চায় না। অনুরূপভাবে অন্যরাও আর অশান্তি চায় না। এর আগে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ইরানের জন্য চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়েছিলেন, ওই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান চুক্তি না করলে ‘একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা মারা পড়বে।’ ট্রাম্পের এ হুমকির মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত পেয়ে সারা বিশ্ব যখন উদ্বিগ্ন, তখন একেবারে শেষ মুহূর্তে তিনি পরিকল্পিত আক্রমণ থেকে সরে আসার এবং ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর করার ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প অবশ্য বরাবরের মতোই দম্ভোক্তি করে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ বিজয়’। তিনি স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, তার সবকিছুই করেছি।’ অথচ বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য যেমন এক ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ ডেকে এনেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও কৌশলগতভাবে চরম ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প শুরুতে ইরানে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ কথা বললেও তা তো হয়ইনি, উল্টো তিনি এখন ইরানের দেওয়া ১০ দফা দাবি মেনে নিয়ে তাকে ‘বাস্তবসম্মত’ বলে আখ্যায়িত করছেন। ট্রাম্পের এই পিছু হটাকে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কিন্তু ফিনিক্সের মতো জেগে উঠেছে ইরান : ট্রাম্প এ যুদ্ধবিরতিকে নিজের ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরলেও বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে ইরানের এক ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় কৌশলগত বিজয় হিসেবেই দেখছেন। যেন গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও বেশি শক্তি নিয়ে জেগে উঠেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির শত শত বোমায় ক্ষতবিক্ষত হয়েও তেহরান শুধু যে টিকে আছে, তা-ই নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা অর্জন করেছে তারা। অন্যদিকে, সামরিক দাম্ভিকতায় উন্মত্ত যুক্তরাষ্ট্র যেন এক অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে জড়িয়ে এক কঠিন শিক্ষা পেয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে আব্বাস আল লওয়াতি লিখেছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রাক্কালে ইরান তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিল; কিন্তু মাত্র ছয় সপ্তাহ পর তারা যেভাবে কৌশলগত বিজয় নিয়ে ফিরে এসেছে, তা পশ্চিমা মিত্র শাহের আমলেও দেখা যায়নি। ট্রাম্প যখন ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বলেন, তখন তিনি মূলত এ প্রণালির ওপর ইরানের একক কর্তৃত্বকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। আগে ইরানের শক্তি ছিল পারমাণবিক সক্ষমতা ও ছায়াগোষ্ঠী, আর এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালিÑ যা বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্বাসরোধকারী পথ। এই যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান এখন আর শুধু হুমকি নয়, বরং তারা ‘উপসাগরের পুলিশে’ পরিণত হয়েছে।

হরমুজ চলবে তেহরানের নিয়ন্ত্রণে : হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তে এ যুদ্ধবিরতি হলেও তা আগের মতো সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সমন্বয় করবে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিবৃতি অনুযায়ীও এ প্রণালিতে নৌ চলাচল এখন থেকে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হবে। এমনকি ওমানের সঙ্গে মিলে প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের পরিকল্পনাও করছে তারা। এর ফলে ইরান শুধু একটি নতুন আয়ের উৎসই পাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ব্যবস্থায় নিজেদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও প্রতিষ্ঠা করছে।

তেলের দাম কমেছে, চাঙ্গা শেয়ারবাজার : যুদ্ধবিরতির এ ঘোষণায় বিশ্ব অর্থনীতি যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে এসেছে। এটি ২০২০ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে তেলের দামের সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাজ্যের গ্যাসের দামও ১৮ শতাংশ কমেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোতেও। জাপানের নিক্কেই থেকে শুরু করে লন্ডনের ফুটসি এবং ওয়াল স্ট্রিটের ডাও জোনসÑসব জায়গায় সূচকের ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

পাকিস্তানে আগামীকাল শান্তি আলোচনা : পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অর্জিত এ যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে বৈঠকে বসছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একে ‘ইতিহাসের এক উজ্জ্বল মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা সুবিধা করতে পারবে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সামরিক চাপে বিপর্যস্ত তেহরান কি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তুলে দেবে ওয়াশিংটনের হাতে? ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করলেও নিজেদের হাতে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ইরান আলোচনার টেবিলে তুরুপের তাস হিসেবেই ব্যবহার করবে।

‘ট্রিগারে আঙুল’ দুই পক্ষেরই : তবে এ যুদ্ধবিরতি যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে, তার ইঙ্গিতও রয়েছে স্পষ্ট। ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডস সরাসরি জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না এবং তাদের ‘আঙুল এখনও ট্রিগারেই আছে’। অন্যদিকে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও হুশিয়ার করে বলেছেন, প্রয়োজনে যে কোনো মুহূর্তে আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন বাহিনী। দুই সপ্তাহের এ যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে কতটা স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম সংশয় রয়েছে। কারণ, এ চুক্তির ভাষা যেমন অস্পষ্ট, তেমনি এতে জড়িয়ে আছে অনেক অমীমাংসিত শর্ত। হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা হাজার হাজার জাহাজ এখনও বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত : সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এই যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে লেবাননকে। ট্রাম্প সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহর কারণে লেবানন এ চুক্তির অংশ নয়। আর এ সুযোগে ইসরায়েল লেবাননে, বিশেষ করে রাজধানী বৈরুতের প্রাণকেন্দ্রে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যা করছে। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বুধবারের হামলায় দেশটিতে কয়েকশ মানুষ হতাহত হয়েছেন।

যুদ্ধ আর ধ্বংসের এ বিভীষিকার মধ্যে দুই সপ্তাহের এ যুদ্ধবিরতি যেন মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো। তবে এ বৃষ্টিতে মরুদ্যান গড়ে উঠবে, নাকি তা আবারও বারুদের আগুনে শুকিয়ে যাবেÑ সে উত্তর লুকিয়ে আছে সম্ভাব্য ইসলামাবাদ চুক্তির ওপর।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ