জাপানিরা আর যা-ই হোক, শিশুরা যাতে ভুল কিছু না শেখে, সেটি ওরা প্রাণপণে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। ওরা মনে করে, ক্লাসরুমে ভুল তথ্য প্রদান বা বিতর্কিত অস্পষ্ট শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, যা দলগত শেখার পরিবেশকে ব্যাহত করে। জাপানি শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুদের সঠিক এবং বস্তুনিরপেক্ষ তথ্য দেওয়ার পরেই শুধু তারা নিজস্ব চিন্তা বা বিশ্লেষণ করতে শিখবে। তথ্যের ভিত্তিই যদি ভুল বা বিতর্কিত হয়, তবে শিশুর যুক্তি ও বিশ্লেষণের মানও ভুল পথে পরিচালিত হবে। তাই ইতিহাস, বিজ্ঞান বা গণিত—যেকোনো বিষয়ে বিতর্ক বা বিভ্রান্তি এড়াতে শুধু সর্বজনস্বীকৃত এবং গবেষণালব্ধ নিখুঁত ও নির্ভুল তথ্যই পাঠ্যপুস্তকে জায়গা পায়। দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি, ২০১৭ সালে ওসাকা ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ভর্তি পরীক্ষার একটি প্রশ্নে সূক্ষ্ম ভুল ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে তা শনাক্ত করতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের পর্যালোচনায় ভুলটি ধরা পড়ে।
পক্ষান্তরে, আমাদের দেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দৃশ্যমান। প্রতিবছর নতুন পাঠ্যবইয়ে হাজার হাজার ভুল, তথ্যের অসংগতি এবং ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা ঘটলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না। ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস অন্তত চার-পাঁচবার আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী এসে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও একপেশে বয়ান পাঠ্যপুস্তকে চাপিয়ে দিয়েছে। এই প্রবণতা বারবার প্রমাণ করেছে যে আমাদের দেশের জাতীয় পাঠ্যবই প্রণয়ন কখনোই নিরপেক্ষ গবেষণার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চার উর্বর জমি। শিশুরা যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পড়ে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোনটি বস্তুনিষ্ঠ সত্য আর কোনটি সাময়িক রাজনৈতিক বয়ান, তা পৃথক করার মানসিক পরিপক্বতা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের থাকে না। ফলে তারা তথ্যের সত্যতা নিয়ে চিরন্তন সংশয়ে ভোগে। যেখানে শিশুর জন্য পাঠ্যবই পরম সত্য এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হওয়ার কথা, সেখানে তারা দেখে যে এই তথ্যগুলো বারবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত হচ্ছে। আর এভাবেই শিশুরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং জাতীয় কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। শিশুরা শিখতে শুরু করে যে সত্য পরিবর্তনশীল ও সুবিধাজনকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং এই দর্শনই আমাদের শিশুদের চরিত্রের সব নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। ইতিহাসের বারবার রূপান্তরের ফলে এ দেশের শিশুদের মনে নিজেদের শিকড়, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে কোনো অখণ্ড চিত্র নেই, বরং ধাপে ধাপে বিভ্রান্তিকর ইতিহাস শিশুদের মধ্যে বিভক্ত মানসিকতা এবং অসহিষ্ণুতা তৈরি করেছে।
এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আইসিটি’ বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ছাপা হয়েছে। এটিকে সামান্য ভুল হিসেবে ধরা যেতেই পারে। ব্যাপারটি অপরাধের নয়, ব্যাপারটি দর্শনের। জ্ঞানের ওপরে প্রজ্ঞাকে স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞা শুধু কোনো তথ্য মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার নাম নয়; এটি হলো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা এবং অন্তর্দৃষ্টির এমন এক সুষম সমন্বয়, যা মানুষকে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়।
বিশ্বসভ্যতায় প্রজ্ঞার নানা কালজয়ী প্রতীক রয়েছে। পশ্চিমা বা প্রাচ্য সংস্কৃতিতে প্রজ্ঞার রূপক হিসেবে নানা প্রতীক ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অন্যদিকে ইসলামিক ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটেছে ‘কলম’, ‘বই’, ‘অ্যাস্ট্রোল্যাব’ অথবা ‘প্রদীপ’-এর মাধ্যমে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে প্রজ্ঞার এমন সর্বজনীন বা ঐতিহ্যগত মার্জিত রূপগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিচার বা পরিমাপের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’কে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা শুধু তথ্যের ভুল থাকে না, বরং এক ধরনের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে ধরা দেয়।
পাঠ্যবইয়ে বারবার ইতিহাস পরিবর্তন এবং জেনেশুনে ভুল তথ্য দেওয়ার পেছনে যে হীন উদ্দেশ্য কাজ করেছে, এযাবৎকাল তা কোমলমতি শিশুদের চিন্তা-চেতনাকে নির্দিষ্ট একদলীয় বা একপেশে বয়ানের মধ্যে বন্দি করে রাখার সচেতন চেষ্টা মাত্র। এই অবহেলা ও অপচেষ্টা শিশুদের মানসিক জগতে যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, তা অপরিসীম।
একটি রাষ্ট্র যখন তার শিশুদের মনে স্বদেশের প্রতি ঘৃণা ও অনাস্থার জন্ম দেয়, তখন বুঝতে হবে সেই জাতির মেরুদণ্ড বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি নির্ভুল, সর্বজনগ্রাহ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের নিখুঁত শিক্ষাব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। পাঠ্যপুস্তককে রাজনৈতিক স্বার্থ ও দলীয় কোন্দলের ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, যোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষাবিদদের হাতে ন্যস্ত করতেই হবে। অন্যথায় আমরা শুধু একটি বিভ্রান্ত প্রজন্মই পাব না, বরং আমরা মুখোমুখি হব একটি আত্মপরিচয়হীন ও ভবিষ্যত্হীন রাষ্ট্রের।
লেখক : কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়