শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

তাহসিফের মৃত্যু রহস্যে নতুন ক্লু

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১ বার

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে গতকাল শুক্রবার পাওয়া গেছে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, মোটরসাইকেলটির সঙ্গে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে। এদিকে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের বক্তব্যে পাওয়া গেছে অসঙ্গতি। দ্বীপের দাবি, পুলিশের ধাওয়ায় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে নিহতের বাবা বলছেন, তার ছেলে সাঁতার জানতেন, এমনকি পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের সনদও ছিল। ফলে তাহসিফের মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকা– তা নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যে দ্বীপকে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এ তথ্য সামনে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাহসিফের বাবা। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর

মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দ্বীপকে আটক করে পিবিআই। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে। আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে করে রাজধানীর উত্তরা থেকে ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফ ও দ্বীপ অবস্থান করছিলেন। এ সময় পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া দিলে দ্বীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ তুরাগ নদে গিয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে দ্বীপ সেখান থেকে সটকে এসে রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন। যদিও দ্বীপের একেক সময় একেক বক্তব্য নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হচ্ছে। ফলে ঘটনার আগে দ্বীপ ও তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাদের সর্বশেষ গতিবিধি কী ছিল, গভীর রাতে দুজন কেন ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন- তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। রহস্য উদ্ঘাটনে গতকাল শুক্রবারও তাহসিফের বন্ধু-স্থানীয় ছোটভাই দ্বীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআয়ের তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

দ্বীপকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর তথ্য দিয়ে গতকাল পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আমরা দ্বীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। দ্বীপ বলেছে, আমরা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ ভাই নদীতে ঝাঁপ দেন। আর আমি পালিয়ে আসি। দুপুরে দ্বীপকে নিয়ে টঙ্গী যাওয়ার পর তার বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে। দ্বীপ বলছে, তাদের পুলিশের পোশাক পরা কেউ ধাওয়া দিয়েছে। কে তাদের ধাওয়া দিল, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তারা মাদকাসক্ত ছিল কিনা, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে জানা যাবে। দ্বীপ অনেক কিছু বলেছে, কিছু তথ্যের অমিলও পাওয়া গেছে। কারণ, দ্বীপ আগের দিন জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিনগত রাত ১২টার দিকে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া শেষে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে তারা দুজন দুদিকে চলে যান। এরপর থেকে তাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি এই দুই ধরনের বক্তব্য কেন দিলেন? রাত ২টার দিকে তারা কেন ওই এলাকায় এসেছিলেন এবং গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে যাওয়ার কারণ কী? আমরা সবকিছু যাচাই-বাছাই করছি। দ্বীপের তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটি তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের ব্যবহৃত বলে বলা হলেও সেটির মালিকানা কার নামে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মাজারবস্তি এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের মালিকানা নিশ্চিত হলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও নদীর ঘাটে পৌঁছানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু মিলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পিবিআইয়ের এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, দ্বীপের সব তথ্য বিশ্বাস না করে প্রতিটি বিষয়ই তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাদের দেখে তারা দৌড় দিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তারা আদৌ কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন কিনা, ইউনিফর্ম পরা পুলিশ ছিলেন কিনা কিংবা কারও দায়িত্ব ছিল কিনা- এসব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে। তাহসিফকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা- এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি।

তুরাগ নদে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য দ্বীপ সামনে আনায় গতকাল শুক্রবার তাহসিফের বাবা একেএম এনায়েতুল করিম জানান, তাহসিফ সাঁতার জানতেন। শুধু তা-ই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের ওপর বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করে সনদও পেয়েছিলেন। তাই দ্বীপের দেওয়া ‘ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার’ তথ্য হাস্যকর। এনায়েতুল করিমের দাবি, মূল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনা আড়াল করা কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে তাহসিফ কখনও গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে- এটা হাস্যকর বক্তব্য? এটা তো প্রশ্নই আসে না? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমারা মনে করছি।

এনায়েতুল করিম আরও বলেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা পারিবারিকভাবে এখনও কোনো ধরনের মামলা করার সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে আমরা চাই, থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির ওপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক। কারণ, আমার ছেলে এ দেশের একজন সুনাগরিক ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে। আমরা মামলা করছি কিনা, সেটির ওপর নজর না দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী যেন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে। দেশে ‘চমৎকার সরকার’ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্বশীল ও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাই মামলা করে আদালতে দৌড়াদৌড়ির ঝামেলায় যেতে অনাগ্রহী আমরা। তাহসিফকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে- ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে প্রশাসন ও সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন নিহতের বাবা।

গতকাল শুক্রবার বিকালে নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানান, বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনও মামলা করেনি তার পরিবার। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে। নৌ-পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ঘটনার তদন্ত করছে। পিবিআই একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, বৃহস্পতিবার রাতে দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার আগে তারা একসঙ্গে ছিলেন। তারা কোথায় গিয়েছিলেন, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাদের শেষ গতিবিধি কী ছিল- দ্বীপের দেওয়া এসব তথ্য মেলানো হচ্ছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ