বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন

কাজে আসছে না ২৪৩ কোটির দুই ভবন

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব আর আকাশছোঁয়া ভাড়ার ফাঁদে পড়ে খুলনায় ২৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি আধুনিক সরকারি ভবন এখন কার্যত অলস হয়ে পড়ে আছে। নগরীর শামসুর রহমান সড়কে ১৫৯ কোটি টাকা খরচে নির্মিত ১৩ তলা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার’ এবং খালিশপুরে ৮৪ কোটি টাকায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ১০ তলা আঞ্চলিক কার্যালয়—দুটি ভবনেরই বড় অংশ তিন বছর ধরে খালি।

চড়া ভাড়ার কারণে বিজ্ঞাপন দিয়েও মিলছে না ভাড়াটিয়া; অন্যদিকে জনবল সংকটে বিশাল অবকাঠামো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এতে ব্যবহার না হতেই একদিকে ধুলো জমছে শতকোটি টাকার বিদেশি সরঞ্জাম ও আসবাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে গড়ে তোলা ঝকঝকে স্ট্রাকচারগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক ধরনের বোঝায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবন দুটি নির্মাণের সময় যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। একদিকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার পরিচালনার জন্য মাসে ৪০ লাখ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ বিল, ভ্যাট ও অগ্রিম ভাড়ার খরচ। অন্যদিকে বিএসটিআই ভবনের প্রতিটি ফ্লোরের মাসিক ভাড়া ৪ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। খুলনার বর্তমান ব্যবসায়িক বাস্তবতায় এত বেশি ভাড়া দিয়ে জায়গা নেওয়ার সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই। ফলে বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড দিয়েও ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।

তথ্য অনুযায়ী, নগরীর শামসুর রহমান সড়কে ১৩ তলা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। তবে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ কনভেনশন সেন্টার এখনো চালু করা যায়নি। এ কনভেনশন সেন্টারে রয়েছে ৬৬টি কক্ষ, ১২০ আসনের মাল্টিপারপাস গ্যালারি, সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুটের রেস্তোরাঁ, সুইমিং পুল, প্রদর্শনী কেন্দ্র, লাইব্রেরি, ৪৫০ আসনের মিলনায়তন, ২০০ আসনের সম্মেলন কক্ষ এবং ৯টি সেমিনার কক্ষ। রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও। ভবন, আসবাব ও সরঞ্জাম মিলিয়ে এতে ব্যয় হয়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। শুধু আসবাব ও সরঞ্জামেই খরচ হয়েছে ১২৫ কোটি টাকার বেশি। অধিকাংশ সরঞ্জাম আনা হয়েছে বিদেশ থেকে।

তিন বছর আগে নির্মাণ শেষ হলেও চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দিয়ে ভবনটি পরিচালনার পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিজ্ঞাপন দিয়েও পাওয়া যায়নি কাঙ্ক্ষিত ভাড়াটিয়া। ফলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় তৈরি বিশাল স্থাপনাটি পড়ে আছে প্রায় অলস অবস্থায়।

অবশ্য ভবনটি নিয়ে আশাবাদী খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন। তার মতে, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার চালু হলে খুলনার জন্য এটি বড় একটি সুবিধা হবে। এখানে হোটেল চালু হলে বাইরে থেকে আসা মানুষের থাকার সুযোগ তৈরি হবে। খেলাধুলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা গেলে দর্শনার্থীদের থাকার সুবিধাও থাকবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে খালিশপুরে ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বিএসটিআইর ১০ তলা আঞ্চলিক কার্যালয় ও ল্যাবরেটরি ভবন। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কিনতে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে ভবনটি চালু হলেও নিচতলার একাংশ থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত বিএসটিআইর কার্যক্রম চলছে। পঞ্চম থেকে দশম তলা পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ বর্গফুট করে জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। ভবনটিতে চারটি লিফটসহ আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু বিশাল আয়তনের তুলনায় ব্যবহারকারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। পঞ্চম থেকে দশম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে ল্যাবরেটরির জন্য বড় বড় কক্ষ তৈরি করে রাখা হয়েছে। ফলে অন্য কোনো কাজে এসব ফ্লোর ব্যবহার করাও কঠিন।

বিএসটিআই সূত্র জানায়, ‘চট্টগ্রাম এবং খুলনায় বিএসটিআইর আঞ্চলিক অফিস স্থাপন ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ২৩৩ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৯ সালে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয় এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ৩০ জুন খুলনা অংশের কাজ শেষ হয়।

খুলনায় বিআইএসটির আঞ্চলিক কার্যালয় ও ল্যাবরেটরিতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬১টি। এর মধ্যে ৩৬টি পদই শূন্য। প্রায় ৭০ হাজার বর্গফুট জায়গায় কাজ করছেন মাত্র ২৫ জন, যাদের মধ্যে ১৯ কর্মকর্তা ও ছয়জন কর্মচারী। বিশাল ভবন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এ কারণে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে আরও ৯ শ্রমিক নেওয়া হয়েছে।

বিএসটিআইর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. লুৎফর রহমান বলেন, একসময় কাজের চাপ বাড়বে এবং আরও জায়গার প্রয়োজন হবে—এমন ধারণা থেকেই ১০ তলা ভবন তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এত বিশাল জায়গা রক্ষণাবেক্ষণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাঁচটি তলা ভাড়া দেওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড দেওয়া হচ্ছে। তবে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, খুলনায় তুলনামূলক কম দামে অফিস বা বাসার জায়গা পাওয়া যায়। ফলে বিএসটিআই নির্ধারিত ভাড়ায় এত বড় জায়গা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার বিষয়টি সামনে আসছে। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ভবন দুটি চালু করতে হলে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিএসটিআই ভবনে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হবে, অন্যদিকে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাগুলোও পড়ে থাকবে অব্যবহৃত।

তাদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই এর সুফল পাওয়া যায় না। ব্যবস্থাপনা, জনবল ও ভাড়ার বাস্তবসম্মত কাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে এসব স্থাপনা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ