বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

মানুষের জীবনে আমল ও সুন্নাহর প্রভাব

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ০ বার
ইসলামী শরিয়তের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—এটি মানুষের জীবনের সব দিকের জন্য পরিপূর্ণ হেদায়েত নিয়ে এসেছে। ইসলাম মানুষের অন্তরকে সংশোধন করে, তার আচরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার কল্যাণ নিশ্চিত করার পথ দেখায়।

ইসলামের বিধানগুলো শুধু তাত্ত্বিক নির্দেশনা বা বিমূর্ত উপদেশ নয়; বরং এগুলোর বাস্তব প্রভাব ও ফলাফল আছে। মানুষের বাস্তব জীবন সেই প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়, অভিজ্ঞতা তা সত্য বলে প্রমাণ করে এবং যুগে যুগে আলেমদের আমল ও পর্যবেক্ষণ তা সমর্থন করে।
আলেমদের বক্তব্যে প্রায়ই এমন কিছু বাক্য পাওয়া যায়—‘এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়’; ‘এটি একটি প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়’; ‘এটি একটি পরীক্ষিত ও প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়’।

এই বাক্যগুলোর তাৎপর্য গভীর।

এগুলো ওহির নির্দেশনা, শরিয়তের সঠিক উপলব্ধি এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে। এখানে উদ্দেশ্য নিছক অনুমাননির্ভর অভিজ্ঞতা নয়; বরং শরিয়তের শিক্ষা বুঝে তা জীবনে অনুসরণ করার মাধ্যমে তার প্রভাব প্রত্যক্ষ করা।
প্রাচীন ও আধুনিক বহু আলেম বিভিন্ন বিষয়ে এই মূলনীতি উল্লেখ করেছেন; যেমন—নামাজ, ইবাদত, দাওয়াত, চরিত্র গঠন, কোমল আচরণ, দান-সদকা, তাওবা ও শরিয়তসম্মত চিকিৎসা। তাঁরা বোঝাতে চেয়েছেন, শরিয়ত যে কল্যাণের দিকে নির্দেশ করে, আন্তরিকতা ও যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ তার অনেক প্রভাব নিজের জীবনে উপলব্ধি করতে পারে।

নিম্নে এ বিষয়ে কয়েকজন আলেমের বক্তব্য ও তার শিক্ষা তুলে ধরা হলো—
নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত

রাখে : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’

(সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, নামাজ যে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, এটি এমন একটি বিষয় যা মানুষ নিজের মধ্যেই অনুভব করতে পারে। অন্যদিকে যেসব মানুষ অনর্থক বিনোদন ও প্রবৃত্তির অনুসরণে ডুবে থাকে, তাদের অন্তর অনেক সময় অশ্লীলতা ও অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

(আল-ইস্তিকামাহ : ১/৩১৮-৩১৯)

সুন্নাহ পরিত্যাগ করলে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে : ইবনুল হাজ্জ (রহ.) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন যথাযথ জ্ঞান অর্জন না করেই আলেমের বাহ্যিক পরিচয় ধারণ করে, তখন মানুষ তাকে আলেম মনে করে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে পারে। সে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে সংকোচ বোধ করে ভুল ফতোয়া দিতে পারে।

এর ফলে সে নিজেও বিপদে পড়ে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, এটি আলেমদের কাছে পরীক্ষিত ও সুপরিচিত বিষয় যে কোনো ক্ষেত্রে সুন্নাহ পরিত্যক্ত হলে তার পরিবর্তে যা-ই করা হোক, তাতে কল্যাণের ঘাটতি দেখা দেয়।
(আল-মাদখাল, ইবনুল হাজ্জ : ১/১৩৬-১৩৭)

ইবাদত শরীরকে কর্মোদ্যমী করে : হাফিজ ইবনু কাসির (রহ.) বলেন, এটি একটি পরীক্ষিত বিষয় যে ইবাদত শরীরকে কর্মোদ্যমী করে ও কোমল রাখে; আর অতিরিক্ত ঘুম শরীরকে অলস করে এবং কঠোরতা সৃষ্টি করে। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৯/৩২২)

শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ ও আল্লাহর কাছে আরোগ্য প্রার্থনা : শাইখ আবদুল আজিজ ইবনু বাজ (রহ.) জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রসঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত, পানিতে কোরআন পড়ে তা পান করা এবং তা দিয়ে গোসল করার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, সবুজ সিদরের সাতটি পাতা পানিতে দিয়ে পিষে ব্যবহার করাও উপকারী হতে পারে—আল্লাহর ইচ্ছায়।

তিনি বলেন, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া এবং তাঁর ওপর নির্ভর করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত আরোগ্যদাতা আল্লাহ তাআলাই।

(ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব, ইবনু বায, শুওয়াইয়ির সম্পাদিত : ৩/৩৭৫)

তিনি আরো বলেন, জাদুকর ও গণকদের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ ও দোয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর অনুমতিতে ক্ষতি দূর হতে পারে।

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে অন্তর প্রশস্ত

হয় : শাইখ মুহাম্মদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দান করলে মানুষের অন্তর প্রশস্ত হয়, মন আনন্দিত হয় এবং হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’

(সুরা ইউনুস, আয়াত : ৬২, তাফসির : সুরা আল-বাকারাহ, ইবনু উসাইমিন : ৩/৩৭৩)

তিনি আরো বলেন, মানুষ যখন আন্তরিকভাবে নিজের সম্পদ ব্যয় করে, বিশেষত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তখন সে নিজের অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করে। (আশ-শারহুল মুমতি : ৬/৮; শারহ রিয়াদিস সালিহিন : ৫/২৩৭)

ঈমান ও তাওহিদ মানসিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে : শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, মানুষ যত বেশি আল্লাহর প্রতি ঈমানদার এবং তাঁর তাওহিদে দৃঢ় হবে, তত বেশি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা লাভ করবে। এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আলে ইমরান : ২/৩০১)

ধৈর্য অশেষ কল্যাণের পথ খুলে দেয় : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দেওয়া হবে।’

(সুরা আয-যুমার, আয়াত : ১০)

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা যুক্ত হলে তা উত্তম পরিণতি ও সওয়াবের কারণ হয়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আলে ইমরান : ২/৬০১-৬০২)

ঈমান যত শক্তিশালী হয়, আনুগত্য তত সহজ হয় : ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, ঈমান মানুষকে আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। ঈমান যত শক্তিশালী হয়, আনুগত্যের প্রতি আগ্রহও তত বাড়ে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষ নিজের মধ্যেই এই পার্থক্য অনুভব করতে পারে : কখনো তার অন্তরে ঈমানের শক্তি অনুভূত হয় এবং ইবাদত করতে ভালো লাগে; আবার কখনো অলসতা আসে এবং ইবাদত কঠিন মনে হয়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আল-মায়িদা : ১/৩৩৩)

উপেক্ষা বিবাদ কমাতে সাহায্য করে : ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, মানুষ অন্যের প্রতিটি কথাকে তার বিরুদ্ধে বিচার করার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলবে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমা, উপেক্ষা ও নীরবতা অবলম্বন করা উচিত। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেউ গালির জবাবে গালি দিলে বিবাদ দীর্ঘ হতে পারে, শত্রুতা ও বিদ্বেষ বাড়তে পারে; কিন্তু সে যদি নিজেকে সংযত করে নীরব থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। (শারহ রিয়াদিস সালিহিন : ৪/২৯৭)

উপহার ভালোবাসা বৃদ্ধির মাধ্যম : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরকে উপহার দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।’

(আল-আদাবুল মুফরাদ)

ইবনু উসাইমিন (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়।’

(শারহুল আকিদাতিস সাফারিনিয়্যাহ : ১/৬০২)

পরিশেষে আল্লাহর আনুগত্য, সুন্নাহর অনুসরণ এবং উত্তম চরিত্র মানুষের জীবনে কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হেদায়েত অনুসরণ করে, সে দুনিয়ায় বহু কল্যাণের প্রভাব অনুভব করতে পারে এবং আখিরাতের প্রতিদানের আশা রাখতে পারে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ