মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক স্থগিত করার পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। এতে রাশিয়া থেকে জ্বালানি রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তেলের বাজারে চাপ বজায় রেখেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সোমবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ২টা ২৭ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার ৯৪ সেন্ট বা ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ১০৭ ডলার ৯২ সেন্টে নেমে আসে। এর আগে শুক্রবার ব্রেন্টের দাম গত ১৯ মে-র পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ কমে ১০০ ডলার ৫৮ সেন্টে দাঁড়ায়। শুক্রবার এই তেলের দাম গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।
গত শুক্রবার রাশিয়ার ওপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক স্থগিত করে নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। গত মাসে স্বাক্ষরিত গ্রাহাম অ্যাক্টের আওতায় এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আহ্বানে আইনটি প্রণয়ন করা হয়।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কীভাবে পড়ছে, তা মূল্যায়ন করতে ট্রাম্প ৬০ দিন পর্যন্ত সময় নেবেন।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ডিজেল রপ্তানি করবে রাশিয়া। চলতি মাসে এর পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল দিয়ে শুরু হয়ে মাসে প্রায় ৭৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। তবে ঘোষিত সরবরাহের বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ ইউক্রেনের ক্ষতি করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে গত শুক্রবার ব্রেন্ট তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছিল। গত মে মাসের পর এই প্রথম দাম ওই পর্যায়ে ওঠে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় অবস্থান এবং সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা আপাতত তেলের দাম বৃদ্ধির গতি কমাচ্ছে।
তবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে জ্বালানি রপ্তানি বাড়তে পারে, এমন সম্ভাবনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানের অস্পষ্টতা বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে জানান তিনি। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিস্তারিত শর্ত ও মেয়াদ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে এমন ধারণা পুরোপুরি দামের মধ্যে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাত দিনের গড় হিসাবে সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৮৫ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অন্তত ১০টি ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে মিশর জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করলেও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের ঝুঁকি বাজারকে অস্থির রাখতে পারে। ফলে আগামী দিনে তেলের দামের গতিপথ নির্ভর করবে সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তনের ওপর।