সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ন

অর্ধশতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী ১০ পাহাড়ি বন্যা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার

সম্প্রতি নেপালে ঘটে গেল প্রলয়ঙ্করী এক বন্যা। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সেতু আর পুরো জনপদ ভাসিয়ে নেওয়া এই রূপ আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির কথা। তবে হিমালয় কিংবা বিশ্বের অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলে এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। জলবায়ুর পরিবর্তন, হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ কিংবা প্রকাণ্ড পাহাড়ি ধসের কারণে বারবার রূপ বদলেছে নদী আর উপত্যকাগুলোর। নেপালের এই সাম্প্রতিক দুর্যোগের সূত্র ধরে ইতিহাসের তেমনই ১০টি ভয়ংকর আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি বিপর্যয়ের পেছনের ঘটনা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি

চামোলি ট্র্যাজেডি, ভারত ২০২১

২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় ঘটে হিমালয়ের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রতিক বিপর্যয়। সেদিন সকালে আকস্মিকভাবে ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা নদী উপত্যকায় ভয়ংকর বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসে।

ঘটনার শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পরবর্তী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা যায়, মূল কারণ ছিল রোন্তি পিকের খাড়া উত্তর ঢাল থেকে শিলা ও হিমবাহের বরফের বিশাল ধস। প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার শিলা ও বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। প্রবল গতির এই ধস দ্রুত কাদা, পাথর, পানি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোতে পরিণত হয়। এরপর তা রোন্তি গাড হয়ে ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা নদী উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।

এই আকস্মিক ঢলে রাইনি এলাকার ১৩ দশমিক ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পূর্ণ ভেসে যায়। ধৌলিগঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৫২০ মেগাওয়াটের তাপোভান-বিষ্ণুগড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুর্যোগে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০৪ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়। চামোলির এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দেয়, হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে শিলা ও বরফের আকস্মিক ধস মুহূর্তের মধ্যেই কীভাবে বিধ্বংসী বন্যা ও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

কেদারনাথ প্রলয়, ভারত ২০১৩

২০১৩ সালের জুনে ভারতের উত্তরাখণ্ডে ঘটে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের বিপর্যয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান কেদারনাথ এবং মন্দাকিনী নদী উপত্যকা। ১৬ ও ১৭ জুনের অস্বাভাবিক ভারী ও টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে যায় এবং ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়। বিপর্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কেদারনাথের উজানে অবস্থিত চোরাবাড়ি হিমবাহ হ্রদের পানি ও আশপাশের ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসা। ভারী বৃষ্টি এবং হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে আকস্মিক পানির ঢল সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতের সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মন্দাকিনী নদী উপত্যকা দিয়ে নিচের দিকে আছড়ে পড়ে। এর ফলে কেদারনাথসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কেদারনাথের এই বিপর্যয়কে শুধু একটি হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি বন্যা, ভূমিধস এবং চোরাবাড়ি হ্রদের আকস্মিক পানি নিষ্কাশন- সব মিলিয়েই এই মহাবিপর্যয় ঘটে। সরকারি হিসাবে উত্তরাখণ্ড দুর্যোগে প্রায় ৫,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয় বলে ধারণা করা হয়। হাজার হাজার মানুষ পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়ে। রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর ও বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়। কেদারনাথের এই প্রলয় আজও ভারতের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পাহাড়ি বন্যা বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করা হয়।

লোনাক হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, ভারত ২০২৩

২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর। ভারতের সিকিমে গভীর রাতে ঘটে ভয়াবহ এক বন্যা। উত্তর সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ হ্রদ থেকে শুরু হয় এই বিপর্যয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাহাড়ি জনপদে নেমে আসে ভয়ংকর পানির ঢল। পরে গবেষণায় উঠে আসে ঘটনার কারণ। হ্রদের আশপাশের পাহাড়ি ঢালে বড় ধরনের ভূমিধস ঘটে। বিপুল পাথর ও ধ্বংসাবশেষ হ্রদে পড়ে। একই সঙ্গে হিমবাহ থেকে বিশাল বরফখণ্ডও পানিতে ভেঙে পড়ে। এতে হ্রদের ভেতরে সৃষ্টি হয় শক্তিশালী ঢেউ।

সেই ঢেউ আঘাত হানে হ্রদের প্রাকৃতিক মোরেইন বাঁধে। একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর হ্রদের বিপুল পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। ঢল গিয়ে মিশে তিস্তা নদীতে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিস্তার পানি ভয়ংকরভাবে বেড়ে যায়। পাহাড়ি নদীর তীব্র স্রোত পথে যা পেয়েছে, তা-ই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় চুংথাং এলাকায়। সেখানে তীব্র বন্যায় ধ্বংস হয়ে যায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের তিস্তা-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ। ভেসে যায় সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, বাড়িঘর এবং বিভিন্ন অবকাঠামো। সিকিমের বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারায়। এই দুর্যোগে সরকারি হিসাবে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ হয় আরও ৭৪ জন। দক্ষিণ লোনাকের সেই রাত ছিল সিকিমের মানুষের জন্য এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। আর পুরো হিমালয় অঞ্চলের জন্যও ছিল একটি বড় সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমবাহ গলছে, বাড়ছে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা ও আকার। ফলে পাহাড়ের বুকে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বিপদের আশঙ্কা।

মেলামচি কাদা-প্লাবন, নেপাল ২০২১

২০২১ সালের ১৫ জুন। নেপালের সিন্ধুপালচক জেলার মেলামচি নদী উপত্যকায় নেমে আসে ভয়াবহ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ঢল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যায় পুরো এলাকার চিত্র।

ঘটনার পেছনে ছিল একের পর এক প্রাকৃতিক ঘটনা। উজানে টানা ও প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। শুরু হয় ভূমিধস। পাহাড় থেকে বিপুল পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নদীতে নেমে আসে। কিছু জায়গায় নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

মেলামচি নদীর সেই স্রোত ছিল সাধারণ বন্যার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। পানির সঙ্গে ছিল বিপুল কাদা, পাথর ও গাছপালা। প্রবল স্রোত নদীর গতিপথ বদলে দেয়। কোথাও নদীর পাড় ভেঙে যায়, কোথাও নতুন পথ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেলামচি বাজার ও আশপাশের জনপদ। বাড়িঘর, সেতু ও সড়ক ভেসে যায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহু এলাকা। প্রাণহানির হিসাবও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ২৫ জন নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী গবেষণায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে কাঠমান্ডু উপত্যকায় পানি সরবরাহের জন্য নির্মিত মেলামচি পানি সরবরাহ প্রকল্প। প্রকল্পের মূল পানি সংগ্রহকেন্দ্র বা হেডওয়ার্কস কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। সড়ক ও সেতুর অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মেলামচির এই বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দেয়, হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, ভূমিধস ও নদী অবরুদ্ধ হওয়ার মতো একাধিক ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

হুয়াসকারান বরফধস ও প্লাবন, পেরু ১৯৭০

১৯৭০ সালের ৩১ মে। পেরুর উপকূলীয় সমুদ্রে আঘাত হানে শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। এর প্রভাবে কেঁপে ওঠে আন্দিজ পর্বতমালা। আর সেই কম্পন থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পাহাড়ি বিপর্যয়।

হুয়াসকারান পর্বতের উত্তর শৃঙ্গের উঁচু অংশ থেকে বিশাল শিলা, বরফ, তুষার ও মাটির স্তূপ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে তা ভয়ংকর ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হয়। প্রায় ১৪ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সেই স্রোত নেমে আসে নিচের জনপদের দিকে। এর গতি ছিল অবিশ্বাস্য। কিছু হিসাবে ঘণ্টায় প্রায় ২৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত। সামনে পড়ে পেরুর ইয়ুঙ্গায় শহর। শিলা, বরফ, কাদা ও পাথরের বিশাল ঢল কয়েক মিনিটের মধ্যেই শহরটির প্রায় সবকিছু চাপা দেয়।// ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ইয়ুঙ্গায়। পাশের রানরাহিরকা শহরের একটি অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের হিসাবে ইয়ুঙ্গায় ও রানরাহিরকায় ১৮ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। অন্য কিছু ঐতিহাসিক হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার বা তারও বেশি বলা হয়েছে। হুয়াসকারানের সেই ধস শুধু একটি শহর ধ্বংস করেনি। এটি বিশ্বকে দেখিয়েছিল, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প কীভাবে বরফঢাকা পাহাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে পুরো একটি জনপদ মুছে দিতে পারে।

সুনকোশী ভূমিধস ও বন্যা, নেপাল ২০১৪

২০১৪ সালের ২ আগস্ট। ভোররাতে নেপালের সিন্ধুপালচক জেলার জুরে গ্রামে নেমে আসে বিশাল এক ভূমিধস। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে সুনকোশী নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় নদীর প্রবাহ। প্রাণ হারায় ১৫৬ জন। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ নদীর ওপর প্রায় ৫০ থেকে ৫৬ মিটার উঁচু একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে। এর পেছনে জমতে থাকে নদীর পানি। তৈরি হয় প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কৃত্রিম হ্রদ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় নয় ঘণ্টা বন্ধ ছিল। পানির নিচে চলে যায় বাড়িঘর, জমি এবং একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের অংশ। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল অন্য জায়গায়। বাঁধটি হঠাৎ ভেঙে গেলে নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা হতে পারত। ঝুঁকিতে পড়ে সুনকোশী নদীর তীরের শত শত জনপদ। এমনকি ভারতের বিহার পর্যন্ত এই বন্যার প্রভাব পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তাই নিচের এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিপদ ঠেকাতে নেপালের সেনাবাহিনী বাঁধে পানি বের করার পথ তৈরি করে। খনন ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে হ্রদের পানি কমানোর চেষ্টা চলে। প্রায় ৩৬ দিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর, বাঁধের একটি অংশ ভেঙে পানি বেরিয়ে যায়। এতে হ্রদের পানির স্তর প্রায় ১৮ মিটার কমে যায়। তবে ভূমিধসের ক্ষত ছিল গভীর। চীন-নেপাল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ আরনিকো হাইওয়ের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। সুনকোশী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আত্তাবাদ হ্রদ ভূমিধস, পাকিস্তান ২০১০

২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি। পাকিস্তানের গিলগিত-বালতিস্তানের হুনজা উপত্যকায় ঘটে ভয়াবহ এক ভূমিধস। পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে হুনজা নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় নদীর প্রবাহ। সেই ধ্বংসাবশেষের পেছনে জমতে থাকে পানি। এভাবেই তৈরি হয় আত্তাবাদ হ্রদ। ভূমিধসে চাপা পড়ে আত্তাবাদ গ্রামের ২৬টি বাড়ি। প্রাণ হারায় ২০ জন। পরে হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রায় ৬ হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। অনেক পরিবার হারায় তাদের জমি ও বসতভিটা। দিন যত গড়ায়, ততই বড় হতে থাকে নতুন এই হ্রদ। ২০১০ সালের জুলাইয়ে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ কিলোমিটারে পৌঁছে। কোথাও কোথাও পানির গভীরতা ছিল ১২০ মিটার পর্যন্ত। হ্রদের পানিতে ডুবে যায় চীন-পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ কারাকোরাম হাইওয়ের ১৯ কিলোমিটারেরও বেশি অংশ। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

তবে বিপদ তখনও কাটেনি। হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় আশঙ্কা তৈরি হয়, প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা নেমে আসতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও প্রকৌশলীরা পাহাড় কেটে একটি স্পিলওয়ে তৈরি করেন। ২০১০ সালের মে মাসের শেষ দিকে সেই পথ দিয়ে পানি বের হতে শুরু করে। পরে পানির স্তর কমতে থাকে এবং বড় ধরনের বাঁধভাঙা বন্যা এড়ানো সম্ভব হয়।

আত্তাবাদ ভূমিধসের ক্ষত অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেই জন্ম নেয় নতুন এক হ্রদ। আজকের আত্তাবাদ লেক সেই বিপর্যয়েরই স্মারক।

কারমাডন হিমবাহধস, রাশিয়া ২০০২

২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। রাশিয়ার উত্তর ওসেটিয়ার ককাস পর্বতমালার কারমাডন উপত্যকায় তখন সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে যায় পুরো এলাকার চিত্র। মাউন্ট কাজবেক অঞ্চলের দঝিমারাই-খোখ পর্বতের খাড়া ঢাল থেকে শুরু হয় বিশাল শিলা ও বরফের ধস। পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিলা, বরফ ও তুষারের বিশাল অংশ নিচে থাকা কোলকা হিমবাহের ওপর আছড়ে পড়ে। এরপর প্রায় পুরো হিমবাহই ভয়াবহ এই ধসের সঙ্গে নিচের দিকে ছুটতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর শিলা-বরফের তুষারধস। বিপুল বরফ, পাথর, পানি ও ধ্বংসাবশেষ জেনালডন নদী উপত্যকা ধরে প্রবল গতিতে এগিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধ্বংসের মুখে পড়ে কারমাডন উপত্যকার বিভিন্ন জনপদ। এটি ছিল একটি ভয়াবহ শিলা ও বরফের ধস, যা পরে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহে রূপ নেয়। ধসের মূল কারণ নিয়ে গবেষণা চললেও পাহাড়ের ওপর থেকে শিলা ও ঝুলন্ত হিমবাহের বরফ ধসে পড়া এই বিপর্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ঘটায়। প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশাল ধ্বংসাবশেষ কারমাডন এলাকার দিকে নেমে আসে। এরপর কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ আরও নিচের দিকে এগিয়ে যায়। অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়। নদীর প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়। এই বিপর্যয়ে ১২০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় বা নিখোঁজ হয়। সবচেয়ে আলোচিত শিকারদের মধ্যে ছিলেন রুশ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক সের্গেই বোদরভ জুনিয়র। তিনি তখন তার নতুন চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে একটি দল নিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। ধসের পর বোদরভ ও তার দলের সদস্যদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোলকা-কারমাডনের সেই বিপর্যয় দেখিয়ে দেয়, পাহাড়ের উঁচু অংশে শুরু হওয়া শিলা ও বরফের একটি ধস কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু কিলোমিটার দূরের জনপদকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ডিগ তশো হিমবাহ হ্রদ প্লাবন, নেপাল ১৯৮৫

১৯৮৫ সালের ৪ আগস্ট। নেপালের খুম্বু অঞ্চলের লাংমোচে হিমবাহের পাদদেশে থাকা ডিগ তশো হিমবাহ হ্রদ হঠাৎ ফেটে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসে ভোতে কোশী ও দুধ কোশী উপত্যকা দিয়ে। ঘটনার শুরু হয় একটি বিশাল বরফধস থেকে। লাংমোচে হিমবাহের ওপর থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার বরফ হ্রদের পানিতে আছড়ে পড়ে। এতে প্রায় পাঁচ মিটার উঁচু ঢেউ তৈরি হয়। সেই ঢেউ আঘাত করে হ্রদের প্রাকৃতিক মোরেইন বাঁধে। একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় ৫০ লাখ ঘনমিটার পানি মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসে। পানির সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথজুড়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় নামচে এলাকার ছোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। প্রায় সম্পূর্ণ নির্মিত নামচে স্মল হাইড্রোপাওয়ার প্ল্যন্ট পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৪টি সেতু। ভেসে যায় প্রায় ৩০টি বাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ ট্রেইল। প্রাণহানিও ঘটে। বিভিন্ন নথিতে নিহতের সংখ্যা চার বা পাঁচজন বলা হয়েছে। তবে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। কারণ ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটে, যখন খুম্বু অঞ্চলে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

ডিগ তশোর এই বিপর্যয় নেপালে হিমবাহ হ্রদ নিয়ে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় নতুন করে গুরুত্ব তৈরি করে। ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পর দেশটিতে বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কাজ আরও গুরুত্ব পায়। হিমালয় অঞ্চলে GLOF-এর ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাড়তে থাকে গবেষণা।

থামে গ্রাম হিমবাহ বন্যা, নেপাল ২০২৪

২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট। নেপালের এভারেস্ট অঞ্চলের থামে গ্রামে হঠাৎ নেমে আসে ভয়াবহ বন্যা। পাহাড় থেকে ছুটে আসে পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় গ্রামের চেহারা। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিধসের কারণে নদীর পথ আটকে এই বন্যা হয়েছে। পরে হেলিকপ্টারে এলাকা পরিদর্শন করে সরকারি দল। স্যাটেলাইট ছবিও বিশ্লেষণ করা হয়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, বন্যার উৎস ছিল হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে আসা। ঘটনাটি ছিল একের পর এক হ্রদ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা। থামের উজানে থাকা দুটি হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ধারাবাহিকভাবে ভেঙে যায়। প্রথম হ্রদের পানি নিচের হ্রদে আঘাত করে। এরপর দ্বিতীয় হ্রদের মোরেইন বাঁধও ভেঙে যায়। বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ তখন ছুটে আসে থামের দিকে। ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক। একটি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হোটেল ও বেশ কয়েকটি বাড়িসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়। স্থানীয় প্রাথমিক হিসাবে ১৪টি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছিল। পরে বিস্তারিত মূল্যায়নে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সংখ্যা আরও বেশি পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিজমি, ট্রেকিং পথ ও সেতুও। এই বন্যায় ১৩৫ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। তবে বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা আগেই পানির গর্জন শুনতে পায় এবং নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে সক্ষম হয়। থামের এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ছোট আকারের হিমবাহ হ্রদও কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে একটি হ্রদ ভেঙে তার ঢল আরেকটি হ্রদকে ভেঙে দিলে বিপদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। হিমালয়ের জনবসতিগুলোর জন্য এ ধরনের ধারাবাহিক হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ এখন বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ