দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে দেশের শেয়ারবাজার। গত ১০-১৫ বছর আগের চেয়ে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত নিম্নমানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছেই। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, ঢাকার শেয়ারবাজারে ৩৬০ কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এরমধ্যে ১২৬টিই খারাপ বা দুর্বল জেড ক্যাটাগরির। অর্থাৎ ডিএসইর ৩৫ শতাংশ বা এক তৃতীয়াংশের বেশি কোম্পানি দুর্বল জেড ক্যাটাগরির। আর বন্ধ বা অস্তিত্বহীন কোম্পানি ৩৫টি বা ১০ শতাংশ।
এদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির এক-তৃতীয়াংশের বেশি জেড বা দুর্বল শ্রেণির হওয়ার ঘটনাকে বাজারের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বক্তিরা। তারা বলছেন, গত ১৫ বছরে একের পর এক মানহীন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়াতেই এমন হয়েছে। বিএসইসির আগের দুই কমিশন এমন অনেক কোম্পানিকে বাজারে এনেছে, যেগুলো কোনোভাবেই উপযুক্ত ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিগত দুই কমিশন দুর্বল ও মানহীন অনেক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে এনেছে। ফলে তালিকাভুক্তির কয়েক বছর না যেতেই এগুলো নামসর্বস্ব কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। বাজারে তালিকাচ্যুতির ব্যবস্থাও নেই। তাই বছরের পর বছর দুর্বল মানের কোম্পানিগুলো কারসাজির হাতিয়ার হয়ে বাজারে থেকে যাচ্ছে। এটি সার্বিকভাবে বাজারে সুশাসনের পরিপন্থি।
জানা গেছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্ধারিত একাধিক শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হলে কোনো কোম্পানিকে জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো- একটানা ছয় মাস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকা, পরপর দুই বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়া, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা
(এজিএম) আয়োজন না করা, কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধনের বেশি হওয়া, ঘোষিত লভ্যাংশের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ না করা, এসব শর্তের যেকোনো একটি পরিপালন না হলে নির্ধারিত সময় পরপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জেড শ্রেণিভুক্ত করে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। তবে পরবর্তী সময়ে শর্ত পূরণ করতে পারলে কোম্পানিগুলোর আবার অন্য শ্রেণিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জেড শ্রেণির কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের পরিসর সংকুচিত হওয়া। একটি বাজারে এতগুলো কোম্পানি দুর্বল মানের হওয়ায় তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করবে। পাশাপাশি লেনদেনের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে।
জানা গেছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এসব শ্রেণি হচ্ছে এ, বি, জি, এন এবং জেড। এর মধ্যে যেসব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় (১০ শতাংশের বেশি), নিয়মিত সাধারণ সভা (এজিএম) করে, সেগুলোকে ভালো মানের কোম্পানি হিসেবে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। যেসব কোম্পানি ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেয়, সেগুলোকে মাঝারি মানের কোম্পানি বিবেচনায় ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। আর ‘এন’ শ্রেণিভুক্ত করা হয় নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে। যেসব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় না, নিয়মিত এজিএম করে না এবং বন্ধ বা লোকসানি, সেগুলোকে ‘জেড’ শ্রেণিতে রাখা হয়। এর বাইরে যেসব কোম্পানি উৎপাদন শুরুর আগে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন পায়, সেগুলো ‘জি’ শ্রেণিভুক্ত হয়। এখন অবশ্য ‘জি’ শ্রেণিভুক্ত কোনো কোম্পানি নেই।
নিয়ম অনুযায়ী, দুর্বল মানের অর্থাৎ জেড শ্রেণির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে কোনো ঋণসুবিধা পাওয়া যায় না। নগদ টাকায় এসব কোম্পানির শেয়ার কিনতে হয়। আবার জেড শ্রেণির কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতেও বাড়তি সময় লাগে। বর্তমানে জেড শ্রেণির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতে সময় লাগে তিন কার্যদিবস। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী যেদিন এই শেয়ার কেনেন তার চতুর্থ দিনে গিয়ে সেটির লেনদেন সম্পন্ন হয়। মূলত এ ধরনের শেয়ার কেনায় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করতেই এ রকম বিধান করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারের দুর্বল ভূমিকা শিল্পায়নের পথে বড় বাধা
বিশ্বব্যাপী শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান উৎস শেয়ারবাজার হলেও বাংলাদেশে এর অবদান এখনও সীমিত। ব্যাংকনির্ভর অর্থ সংগ্রহের কারণে মূলধন বাজার হচ্ছে উপেক্ষিত। বিশ্বজুড়ে যেসব দেশ দ্রুত শিল্পোন্নয়ন ঘটাতে পেরেছে, তাদের পুঁজিবাজারগুলোও হয়েছে গতিশীল ও শক্তিশালী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারের পরিবর্তে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণেই বেশি আগ্রহী। ফলে শিল্পায়নে শেয়ারবাজারের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে।
উদ্যোক্তারা ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় দেশের শেয়ারবাজার রয়ে গেছে মূলধারার বাইরে। যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির সংখ্যা তিন হাজার ৭৭৭টি। অথচ দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩৯৭টি। অর্থাৎ যত সংখ্যক পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নিবন্ধন রয়েছে তার মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ারবাজারে এসেছে। বাকি ৯০ শতাংশই শেয়ারবাজারের বাইরে রয়ে গেছে।
এদিকে শেয়ারবাজারে যে কোম্পানিগুলো এসেছে, তার একটি বড় অংশের আর্থিক ভিত্তি বেশ দুর্বল। ফলে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে বিভিন্ন সময় নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশি-বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারী দেশের শেয়ারবাজার ছেড়ে চলে গেছেন।
জানা গেছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হওয়া কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের কারখানা বন্ধের তথ্য জানিয়েছে ডিএসই। তাতে বলা হয়েছে, গত ১ আগস্ট থেকে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, গত ১০-১৫ বছরে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। যেগুলো তালিকাভুক্ত হয়েছে সেগুলোও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ফলে বাজার ছোট হয়ে আসছে। ৮০ শতাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা নেই। তবে নতুন কমিশন ভালো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির কথা বলেছে। এর বিকল্প নেই।
ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, গত ১০-১৫ বছরে বাজারে ভুয়া স্টেটমেন্ট দিয়ে ম্যানুপুলেট করা হয়েছে। এটি সংঘবদ্ধভাবে চিট করা হয়েছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। খারাপ কোম্পানি ডিলিস্ট করতে হবে।