মার্চ মাসে যখন মাউরিসিও পচেত্তিনো বলেছিলেন যে, এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র শিরোপা জেতার অন্যতম দাবিদার হতে পারে, তখন খুব কম মানুষই তার কথায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ, গত দশটি বিশ্বকাপের মধ্যে নয়টিতে অংশ নিলেও ২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল ছাড়া শেষ ষোলোর বাধা পেরোনোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এবার চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্জেন্টিনার সাবেক এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দল কেবল নকআউট পর্বই নিশ্চিত করেনি, বরং তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলী ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন মার্কিন সমর্থকরা কেবল মাঠের লড়াই দেখছেন না, তাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কেন আমরা নই?
পচেত্তিনোর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র দলের এই রূপান্তর যেন রূপকথার মতো। গত সপ্তাহে সিয়াটলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় এবং এর আগে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের দুর্দান্ত জয় প্রমাণ করে যে, দলটি এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আন্ডারডগ মনে করে না। দলের অন্দরমহলের চিত্রটা পাল্টে দিয়েছেন পচেত্তিনো। তার ড্রেসিংরুমের দেয়ালে লেখা ‘কেন আমরা নই’, ‘বিশ্বাস করো, কাজ করো, লড়াই করো’ এবং ‘এখনই আমাদের সময়’; এই কথাগুলোই খেলোয়াড়দের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও আগ্রাসী মানসিকতা তৈরি করেছে। দলের ফরোয়ার্ড টিম উইয়াহর ভাষায়, পচেত্তিনো দলের মধ্যে সেই দক্ষিণ আমেরিকান স্পিরিট বা জেদ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, যা এতদিন তাদের মধ্যে ছিল না।
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি পচেত্তিনোর সঙ্গে ভক্তদের রসায়নও এখন চোখে পড়ার মতো। সিয়াটল স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর খেলোয়াড় ও সমর্থকদের একাত্মতা ছিল দেখার মতো। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’-এর সুর। সমর্থকদের কাছে পচেত্তিনো এখন এক ‘ব্রেভহার্ট’ বা সাহসী নেতার প্রতীক। টটেনহ্যামের সাবেক এই কোচকে নিয়ে মার্কিন ফুটবল সমর্থকদের উন্মাদনা এতটাই যে, যারা এতদিন ফুটবল নিয়ে সেভাবে ভাবতেন না, তারাও এখন দলের সাফল্যে মেতে উঠেছেন। তাদের মতে, পচেত্তিনো কোনো রাজনৈতিক চাপ বা জটিলতা ছাড়া কেবল জয়ের নেশায় দলকে খেলাচ্ছেন, যা মার্কিন ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা করেছে।
পচেত্তিনোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ এই বিশ্বকাপ পর্যন্তই। তিনি ইউরোপের বড় কোনো ক্লাবে ফিরে যাবেন বলে শোনা যাচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং সমর্থকদের ভালোবাসা হয়তো তার সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারে। পচেত্তিনো নিজেও ইদানীং তার উত্তরসূরি হওয়ার চেয়ে এই দলের সাথে দীর্ঘমেয়াদী উত্তরাধিকার গড়ে তোলার কথা বলছেন। তিনি মনে করেন, জয় গুরুত্বপূর্ণ, তবে সবচেয়ে জরুরি হলো জাতীয় দলের সাথে সমর্থকদের এই শক্তিশালী সংযোগ রক্ষা করা। এখন দেখার বিষয়, এই বিশ্বকাপ শেষে পচেত্তিনো যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান কি না, তবে আপাতত মার্কিন ফুটবল প্রেমীদের চোখে একটাই স্বপ্ন, বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের পথে তাদের দল এখন সত্যিই অপ্রতিরোধ্য।