মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

মিন্নি রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মোবাইল ফোন গায়েব!

মিন্নি রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মোবাইল ফোন গায়েব!

স্বদেশ ডেস্ক:

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যার এক মাস পূর্ণ হল । গত ২৬ জুন সকাল সোয়া ১০ টার দিকে শত শত লোকের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করেন নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ তাদের সহযোগীরা। এরপর বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রিফাত শরীফ। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি ভিডিও ভাইরাল হলে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে সমগ্র দেশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি ওঠে সব মহলে।

প্রধানমন্ত্রীও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। এরপর থেকে একে একে গ্রেফতার হয় এ মামলার এজহারভুক্ত সাত আসামিসহ ভিডিও ফুটেজ ও তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আরও আট অভিযুক্ত। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের সাতদিন পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় এ মামলার প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড।

এ মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকেও পুলিশ গ্রেফতার করে এবং রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসবাদ করার পর জেলহাজতে পাঠিয়েছে। মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানো নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠছে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে। কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরগুনার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হত্যাকান্ডের এক মাসের মধ্যে এ মামলার তদন্ত কার্যক্রম একদম শেষের পথে। এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা বেশ কিছু আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিশেষজ্ঞদের মতামতের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এসব আলামতের মধ্যে নয়ন বন্ডের বাসা থেকে জব্দ করা মেয়েদের একটি জামা, একটি চিরুণী, খোদাই করে শামুকের গায়ে এন+এম লেখা একটি শামুক, নয়ন ও মিন্নির একসঙ্গে ছবি রয়েছে।

আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনে মধ্যেই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন জানান, দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অত্যন্ত সতর্কভাবে রিফাত শরীফ হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করে মামলার তদন্তের বেশ অগ্রগতি হয়েছে।

ইতোমধ্যেই এ মামলার ১৫ জন অভিযুক্ত গ্রেফতারের পর আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার এজহারভুক্ত অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। কোনো প্রকার অবহেলা এবং কালক্ষেপণ না করে এ মামলার চার্জশিট দ্রুত আদালতে দাখিল করা হবে।

কারাগারে মিন্নি ভালো আছেন : চিকিৎসক

প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি রয়েছেন বরগুনা জেলা কারাগারে। গত ১৯ জুলাই শুক্রবার রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর থেকে বরগুনা জেলা কারাগারে রয়েছেন মিন্নি।

মিন্নির সঙ্গে দেখা করেন তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুল বারী আসলাম। তারা উভয়ই দাবি করেন, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় পুলিশের নির্যাতনে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মিন্নি। তাই তার চিকিৎসা প্রয়োজন। এছাড়াও পুলিশের শিখিয়ে দেয়া স্বীকারোক্তি আদালতে বলেছেন মিন্নি। তাই এ স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করতে চান মিন্নি।

জেলহাজতে মিন্নির চিকিৎসায় যাওয়া বরগুনা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি মেডিকেল অফিসার ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, মিন্নি তেমন কোনো গুরুতর অসুস্থ নয়। একটু শারীরিক ব্যথা-বেদনা থাকতে পারে। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে, তাই মানসিকভাবে একটু চাপে আছে। ভয়ের কিছু নেই, দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। তিনি অনেক ভালো আছেন। তবে তার ঘুম কম হচ্ছে।

মিন্নিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে কি না, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, না তেমন কোনো কিছু দেখা যায়নি। তাছাড়া মিন্নিও তেমন কিছুই বলেননি। সকালবেলা যেহেতু জেলখানার কিছু নিয়ম-কানুন আছে, সেহেতু সকালে তিনি ঘুমাতে পারেন না। আমরা কারা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি, উনি যতটুকু রেস্ট নিতে চান, তিনি যেন তা নিতে পারেন। জেল কর্তৃপক্ষও সেটা দেখবেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে মহিলা ডাক্তারও ছিলেন। মিন্নির পরিবারের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। উন্নত চিকিৎসার জন্য মিন্নির পরিবার তাঁকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। এর জবাবে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে তেমনটি মনে হয়নি।

মিন্নির শারীরিক অবস্থা জানতে ও তার খোঁজ খবর নিতে কথা হয় বরগুনা জেলা কারাগারের সুপার মো. আনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেন, মিন্নি আদৌ অসুস্থ না।

মিন্নি, রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মোবাইল ফোন গায়েব 

মিন্নিকে এ হত্যায় দায়ী করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ঘটনার আগে-পরে অসংখ্যবার মিন্নি নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। রিমান্ড আবেদনেও তদন্ত কর্মকর্তা এমন কথাই বলেন। অথচ নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী বা মিন্নি, কারও মোবাইল ফোন এখনো জব্দই করতে পারেনি পুলিশ। প্রযুক্তিগত আলামত হিসেবে দুটি জব্দ তালিকায় পাঁচটি মোবাইল ফোন ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হলেও এই তিনজনের কারও মোবাইলই সেখানে নেই। এখন প্রশ্ন হলো, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই তিনজনের মোবাইল ফোন গেল কোথায়?

এদিকে, নয়ন বন্ডের মায়ের দাবি অনুযায়ী ঘটনার পরদিনই পুলিশ তার বাড়িতে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার মেশিন (ওই মেশিনে ভিডিও সংরক্ষণের জন্য হার্ডডিস্ক লাগানো থাকে) ও কম্পিউটার নিয়ে আসে। ভাংচুরও চালায় ঘরে। ওই হার্ডডিস্কে ও কম্পিউটারে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলামত থাকার সম্ভাবনা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ওইসব যন্ত্রপাতি তারা পাননি। পুলিশ না আনলে গুরুত্বপূর্ণ ওই আলামতগুলো কে নিল, এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা। অনেক আসামি। তাই আমরা দুটি জব্দ তালিকায় পাঁচটি মোবাইল ফোন ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। এর মধ্যে একটি ফোন মিন্নির মায়ের বলে দাবি করেন তিনি। মোবাইল ফোনের সঙ্গে হত্যায় জড়িত ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের কিছু আলামত ও কিছু ফেসবুক আইডিও ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, আসামি রিফাত ফরাজী সাত দিন পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এরপরও তার মোবাইল জব্দ না হওয়া সন্দেহজনক। আর নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ক্রসফায়ার যেখানে হয়েছে, সেখান থেকে পিস্তল, রাম দাসহ নানা রকম অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। তবে মোবাইল উদ্ধার হয়নি। এটাও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন স্থানীয় একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি।

এদিকে নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ারের পর গণমাধ্যমকর্মীরা তার মোবাইল সম্পর্কে জানতে চাইলেও পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বলে জানান স্থানীয় একজন গণমাধ্যমকর্মী।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, পুলিশ শুরু থেকেই আমার মেয়েকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তাই তারা তদন্ত তাদের সুবিধা মতোই করছে। এ জন্যই আমি পিবিআইয়ের তদন্ত চেয়েছি। তিনি বলেন, তদন্ত শেষ না হতেই এসপি সাহেব বলে দিচ্ছেন আমার মেয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত। রিমান্ডে নিয়ে আমার মেয়েকে নির্যাতন করে জবানবন্দি আদায় করেছে। তাই পুলিশের এই তদন্তে আমি আর বিশ্বাস করি না।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877