শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

যুগল-জীবন স্বপ্নের নির্মম সমাধি

যুগল-জীবন স্বপ্নের নির্মম সমাধি

স্বদেশ ডেস্ক: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার দুটি গ্রাম কান্দাপাড়া ও চরঘাটিনায় গতকাল সারাদিনই ছিল শোকের মাতম। এ দুটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন যথাক্রমে রাজন (৩২) ও সুমাইয়া খাতুন (২১)। নদীর দুই ধারার মতো এ দুটি মানুষ এক মোহনায় এসে মিলেছিলেন গত সোমবার। নতুন এক যুগল জীবন শুরুর স্বপ্ন নিয়ে সেদিনই বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন তারা। কিন্তু তাদের সব

আশা আর স্বপ্ন নিমেষেই পরিণত হয়েছে নির্মম সমাধিতে। যুগল জীবন শুরুর আগেই নিভে গেছে তাদের জীবনপ্রদীপ। সুমাইয়াকে বিয়ে করে স্বজনবেষ্টিত রাজন তাদের বাড়ি ফেরার পথে অরক্ষিত একটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের ওপর এসে হামলে পড়ে একটি ট্রেন, মাইক্রোবাসটিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় অনেকটা দূর পর্যন্ত। এতে করে বর ও কনেবেশী রাজন ও সুমাইয়া ছাড়াও মাইক্রোবাসের ৯ আরোহীর সবাই নিহত হন। হৃদয়চেরা এ ঘটনায় বিয়ের বাদ্যবাজনার শব্দ মিলিয়ে যায় স্বজনদের অশ্রুসিক্ত হাহাকারে।
গতকাল ছিল নিহতদের জানাজা। রাজন ও সুমাইয়ার জানাজায় ছিল শোকার্ত দুই গ্রামের মানুষের ঢল। এদিন নিহত আরও ৯ বরযাত্রীরও জানাজার পর নিজ নিজ গ্রামে দাফন সম্পন্ন হয় স্বজনদের আহাজারি ও গ্রামবাসীর শোক প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
গ্রামের মানুষ বেদনার্থ চিত্তে নিহতদের স্মরণের পাশাপাশি আক্ষেপ করছেন এই বলে যে, রেলক্রসিংটি যদি অরক্ষিত না হতো, তাহলে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটত না। রাজনের বাবা আলতাফ হোসেন সন্তান হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায়। তিনি বলেন, আমার একটিই দাবিÑ আর কাউকে যেন এমন পরিণতি ভোগ করতে না হয়। কোনও পিতার যেন বহন করতে না হয় পাহাড়ের চেয়েও ভারি সন্তানের লাশ।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সুমাইয়ার লাশ তাদের বাড়ি পৌঁছে। এ সময় স্বজনদের কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সুমাইয়ার মা সদ্যমৃত মেয়ের পাশে বসে বিলাপ করছিলেন। নতুন জীবন গড়বে বলে যে মেয়েকে তিনি একদিন আগে তুলে দিয়েছিলেন কনের সাজে পাত্রের হাতে, পরদিনই তার জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাবে, তা তিনি কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
গতকাল ভোরে সিরাজগঞ্জ জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের মর্গ থেকে ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ তাদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বেলা ১১টায় কান্দাপাড়া ও চরঘাটিনা কবরস্থানে জানাজা শেষে সুমাইয়া, রাজন ও তাদের স্বজনদের মরদেহ দাফন করা হয়।
সিরাজগঞ্জ জিআরপি থানার ওসি হারুন মজুমদার জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাইক্রোবাস চালকের পরিচয় অজানা দেখিয়ে একটি মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রেন-মাইক্রোবাস দুর্ঘটনার রাতেই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আবদুল্লাহ আল মামুনকে আহ্বায়ক করে।
তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তরফেও ৬ সদস্যের পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বলা হয়েছে, ৫ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে।
দুর্ঘটনায় বর রাজন ও কনে সুমাইয়া ছাড়া নিহত অন্যরা হলেন- উল্লাপাড়ার এনায়েতপুর গুচ্ছগ্রামের আশরাফ আলীর স্ত্রী মমতা (৩৫), সদর উপজেলার রামগাতীর মৃত আব্দুছ ছালামের ছেলে শফিউল (১৯), মৃত মশিউর রহমানের ছেলে আবদুস সামাদ (৪৫), আলিফ (৯), সয়দাবাদের নূর আলম (৩৫), সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার দিয়ার ধানগড়া মহল্লার আলতাফ হোসেনের ছেলে শরীফ (৩২), রায়গঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণদিয়ার গ্রামের আলম শেখের ছেলে খোকন (২৪) এবং শহরের সয়া ধানগড়া মহল্লার আহাদ আলী (২১) ও সোহেল।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877