শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন

সো দি ব্লাইন্ড ম্যান সীজ বেস্ট

সো দি ব্লাইন্ড ম্যান সীজ বেস্ট

অনুচয়ণেঃ কাজী কাসেম:

ইংরেজ কবি ডিলান  টমাস এঁর কবিতার একটি চরণ ও বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাসের একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি দিয়ে আজকের লেখাটা শুরু করছি। ডিলান টমাসের কবিতার চরণটি শিরনামে উল্লেখ করেছি। কবি জীবনানন্দ দাসের কবিতাংশ- অদ্ভুত এক আঁধার এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সব চেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা/যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই,প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সু পরামর্শ ছাড়া।মদ্যপান একবার শুরু করলে এর নেশা বা চাহিদা ক্রমাগত ভাবে বাড়তেই থাকে এবং সেচ্ছা নিয়ন্ত্রণের আর কোন সম্ভবানাই থাকেনা।মাতালের শেষ পরিণতি হয় করুণ মৃত্যু ও নিজ পরিবারের জন্য অপেক্ষা করে অন্ধকারচ্ছন্ন অমানিশা। ক্ষমতার লিপ্সা মাদকতার চেয়ে আরও ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে নিজের জন্য, নিজের পারিষদবর্গ ও দেশের জনগণের জন্য।বাক হীন জনগণের চোখের সামনে উন্নয়ন ও সুশাসনের রঙ্গীন ছবি প্রদর্শিত হতে থাকে বিরামহীন ভাবে।   পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্ষমতা লোভী রাষ্ট্র নায়কদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যায় যে নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার হেন কর্ম নাই যা তারা করেনি। দেশের জনগণের জন্য এরা মেকি প্রেম প্রীতি উদ্গীরণ করতে সদা বাঙময় কিন্তু এদের মুখে থাকে শেখ ফরিদ আর বগলে থাকে ইট। মুখে এদের জনগণের প্রেম প্রীতির করুণা ধারা কিন্তু এদের হৃদয়ে –‘প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই’। এদের মুখে শান্তির বাণী সেই ইতিহাসের বহুল কথিত ও নিন্দিত হিটলারের মত। হিটলার বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার আগে তার সেনাধক্ষ্যদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় করেন। সভায় তদানীন্তন বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ শেষে তিনি জানতে চাইলেন- নাউ জেন্টলম্যান টেল মি হোয়েদার উই ওয়ান্ট পিস অর ওয়ার-সেনাধ্যক্ষরা এক বাক্যে বলে উঠলেন- উই ওয়ান্ট পিস। হিটলার সাহেব তড়িৎ গতিতে চেয়ার উঠে নিজ রিভলবার থেকে ঊর্ধ্বাকাশে গুলি ছুড়ে ঘোষণা করলেন ‘নাউ লেট আস ফাইট ফর পিস’। পার্শ্ববর্তি দেশ পোলাল্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে বলদর্পী হিটলার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা ঘটালেন।

মহামতি বৈজ্ঞানিক আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কৃত এটম  বোমার প্রপিতামহ ডিনামাইট বিক্রয় লব্ধ রেখে যাওয়া অর্থ দিয়ে প্রদত্ত নোবেল পুরষ্কার নিয়ে সারা পৃথিবীতে অফুরন্ত ঢাক ঢোল পিটানো হয়। নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়ার জন্য অনেক দেশের স্বৈরাচারী শাসকেরও চেষ্টার অন্ত থাকেনা। মিলিয়ন ডলার খরচ করে ডাকসাইটে লবি ফার্ম নিয়োগেরও কানাঘুষা শোনা যায়। মহামতি আলফ্রেডের আবিষ্কৃত ডিনামাইটের অধস্তন প্রজন্ম আনুবিক বোমার বদৌলতে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগর দু’টি ধংসস্তূপ হয়ে যায়। হিটলারের হটকারিতায় শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যুর খতিয়ান দেখলে ‘আশু আনে সিমারের ছোরাতে’।এই যুদ্ধে প্রাণঘাতের সংখ্যা- ফ্রান্স- দু’লক্ষ ১০ হাজার, আমেরিকা যুক্ত্রাষ্ট্রের-দু’ লক্ষ ৯৮ হাজার, ব্রিটেন- ১ লক্ষ ৫৭ হাজার, ইটালি- ১ লক্ষ ৯৩ হাজার,জাপান- ১৯ লক্ষ ৭২ হাজার, জার্মানি- ৪২ লক্ষ, সোভিয়েত রাশিয়া- ১কোটি ৮০ লক্ষ। এ ছাড়াও যুদ্ধে অংশ নেয়নি এমন অনেক দেশের অনেক মানুষ বলী হয়েছে এই যুদ্ধের। কি ভয়াবহ চিত্র!

যুগে যুগে যুদ্ধবাজ রাজা/শাসকেরা কখনো কখনো জাতির শ্রেষ্টত্ব বজায় রাখা, কখনো কল্পিত শ্ত্রু নিধন, কখনো বহিরশক্তি প্রতিরোধের জিকির তুলে বাকহীন জনগণকে যুদ্ধের গোলা বারুদ বানাতো। বাক প্রতিবন্দি জনগণ প্রকৃত উদ্দেশ্যটা বুঝলেও আড়ালে আবডালে উহঃ আঃহ করলেও প্রকাশ্যে বলতে হতো ‘গড সেভ আওয়ার কিং, লং লিভ আওয়ার কিং। রাজার ও রাজার মহামতি চাটুকারদের সুরে সুর মিলায়ে বাকহীন জনগণকে বলতে হয়- ‘ধণ্যি রাজার পুণ্যির দেশ’।আধুনিক যুগে  সে সদাশিব রাম রাজাও নাই, পুণ্যি ভূমি রাম রাজত্বও নাই। আছে, জনগণের স্ব ইচ্ছায় বা বাধ্যতামূলক ইচ্ছায় নির্বাচিত আধুনিক কালের রাজা বা রানী সদৃশ্য মূল কর্তা ও তার পারিষদ দল। এঁরা তাঁদের ক্ষমতার মসনদ পাকা পোক্ত করার জন্য বাকহীন জনগণের চোখে মেকী উন্নয়নের রঙ্গিন ফানুস উড়াতে থাকে এবং চাটুকার পারিষদবর্গ জয়ঢাক বগলে নিয়ে যাত্রা পালার দোহার দলের মত বলতে থাকে দেশ বিদ্যুৎ গতিতে শণৈ শণৈ উন্নয়নের সর্বশেষ ধাপে পৌঁছে যাবার পথে। উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার জন্য আমাদের কোন বিকল্প নাই। কাজেই আমাদেরকে নির্বাচিত করার জনগণকে কষ্ট করে আর ভোট কেন্দ্রে যেতে হবেনা। আজরাইল ফেরেস্তা মানুষের জান কবচ করার জন্য মানুষের মাথার দিকে বসে দেহ পিঞ্জর থেকে রুহুটা হ্যাকচা টান দিয়ে বের করে আনে। আদুনিক কালের গাদ্দাফি ও ‘ইদি আমিনেরা’ শিয়রে আজরাইল দেখে তড়িৎ গতিতে ‘শিয়র’ পাল্টাতে থাকে। তবে বার বার শিয়র পাল্টালেও তাঁদের শেষ রক্ষা হয়না- আজরাইল (আঃ ছাঃ) হ্যাচকা টানে দেহ পিঞ্জর থেক রুহুটা বের করে আনবেই। এটাই সব বাগাড়ম্বর রাজাদের পরিণতি। অন্য দিকে ক্ষমতার মোহজাল থেকে মুক্ত ‘নেন্সন মেন্ডেলা ওরফে ‘আদিবা’রা  জনগণের হৃদয় সিংহাসনে চির আসীন থাকে। দেশের বাক দৃষ্টিহীন জনগণ ‘ সীজ বেষ্ট’।

মানুষের দেহ পিঞ্জরে রয়েছে ‘কাল্ব’। এই ‘কাল্ব’ এর চালিকা শক্তি ‘নবসে মোয়াম্মারা’ ও ‘নবসে আম্মারা’। এক কথায় বলা যায় ‘ভাল প্রবৃত্তি ও ‘মন্দ প্রবৃত্তি’।ভাল প্রবৃত্তি মানুষকে ভাল কাজ করতে উৎসাহিত করে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নফসে আম্মারা মানুষকে মন্দ কাজে প্রলুব্ধ করে। একদা ফেরেস্তা কুল আক্ষেপের সুরে স্বগোক্তি করল-‘ দিন রাত তারে এত সেবা করি, এত করে তারে তুষি /তবু তিনি যেন খুশি নন/ যত স্নেহ মায়া ঝরে পাপ আসক্ত কাদা ও মাটির মানুষ জাতির পরে’। উত্তরে  ফেরেশতা কুলকে লক্ষ্য করে মহান আল্লাহ্‌বললেন- আমি আদমকে পরীক্ষা করার জন্য দুর্বল মন দিয়ে ওদেরকে পৃথিবীতে নির্বাসিত করেছি। আর ঐ লোভ লালসা ভরা পৃথিবীর ‘কমল দিঘিতে এক শ’ হয়েছে এক আকাশের চাঁদ’। ফেরেশতারা পৃথিবীর কমল দিঘিতে এ হেন অবস্থাটা দেখার আব্দার করলে হারুত ও মারুত নামক দুইজন পরহেজগার ফেরস্তার কালবে ‘নফসে আম্মারা প্রবিষ্ট করে তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠায়ে দিল। দুনিয়ায় এসেই হারুত মারুত নফসে আম্মারার প্রভাবে প্রলুব্ধ হয়ে তাদের ফেরেস্তা কৌলীন্য বিকায়ে দিল  ডাগর নয়না নগর কন্যার আলতা মাখা রাঙ্গা পায়। আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাকুলকে ডেকে বলল-‘ চেয়ে দেখ হারুত মারুতে  কি করেছে ধরণী সর্বনাশী’।

ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আজ জ্ঞান তাপস হওয়ার সাধনার পরিবর্তে অপরাজনীতির দলদাসের ব্রত গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরিচিতি হওয়ার কথা জ্ঞান পরিচ্ছদ আর নিষ্ঠার অলঙ্কার দিয়ে। এখন সেই শিক্ষকদের পরিচিতি মাপা হয় লাল, নীল, সাদা কাল রং দিয়ে। কয়েকদিন আগে নীল দলের দলদাস শিক্ষকদের লজ্জাকর মারামারি হাতাহাতি ও রক্তারক্তির দুঃসহ ঘটনা জাতির কপালে কলঙ্কের তিলক একে দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চত্তরে চির বিশ্রামে থাকা উপরে উদ্ধৃত  কবিতাংশের রচয়িতা  জাতীয় কবি কাজি নজরুল  ঐতিহ্যবাহি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলদাস শিক্ষকদের রক্তাক্ত মারামারির শব্দ শুনে নিশ্চয়ই স্বগোক্তি করেছে-  শিক্ষা গুরু সবার সেরা, সেই গুরুদের কি করেছে অপ রাজনীতি সর্বনাশী। তিনি হয়ত আরও স্বগোক্তি করেছেন- যদি সম্ভব হতো – হেতা আর নয়/ চলে যেতাম অন্য কোথা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877