শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন

বিএনপির কাছে ‘উপযুক্ত’ মূল্যায়নের আশায় মিত্ররা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার

বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশগ্রহণ করে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। নির্বাচনের পর অঙ্গীকার অনুযায়ী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের দুই শরিককে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করেছে দলটি। তবে প্রধান শরিকের কাছে ‘আরও’ মূল্যায়নের প্রত্যাশা মিত্রদের। তারা চান, যুগপতের অন্য শরিকদের মধ্য থেকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আরও দু-একজনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হোক। এ ছাড়া বাকিদের যোগ্যতা অনুযায়ী অন্যভাবে মূল্যায়নের দাবি তাদের। আর ধানের শীষ কিংবা বিএনপির সমর্থনে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করে শরিকদের মধ্যে যারা পরাজিত হয়েছেন, তারা সংসদের উচ্চকক্ষে যেতে চান। এ জন্য বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন তারা। শরিকদের দাবি, সরকার চাইলে তাদের শতভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, সরকারের মধ্যে শরিকদের এখনো নেওয়ার সুযোগ আছে। আর সরকারের বাইরে জাতীয় সংসদভিত্তিক যে পদগুলো খালি আছে, সেখানেও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো যারা আন্দোলনে ছিল, তাদের নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিএনপির অঙ্গীকার রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার হঠানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা হবে। সেটা তো এখনো পরিপূর্ণ হয়েছে বলে মনে হয় না, সুযোগ আছে। সরকার যদি মনে করে, তাদের বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি। এবারের নির্বাচনে শরিকদের জন্য ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় দলটি। তাদের মধ্যে আট শরিক ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। অবশ্য বিজয় নিশ্চিত করতে কৌশলের অংশ হিসেবে তাদের মধ্যে সাতজনকেই বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ থেকে সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ থেকে রেদোয়ান আহমদ, ঝিনাইদহ-৪ থেকে রাশেদ খান, হবিগঞ্জ-১ থেকে রেজা কিবরিয়া, নড়াইল-২ থেকে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ এবং ঢাকা-১৩ থেকে ববি হাজ্জাজ ধানের শীষে ভোট করেন। এ ছাড়া যশোর-৫ আসন থেকে ১২ দলীয় জোটের শরিক ‘অনিবন্ধিত’ জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাসও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে তাদের মধ্যে কেবল শাহাদাত হোসেন সেলিম, রেজা কিবরিয়া এবং ববি হাজ্জাজ এই তিনজন বিজয়ী হন।

অন্যদিকে সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী বিএনপির সমর্থনে পাঁচটি দল আটটি আসন থেকে নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা-১২ আসনে, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ এবং জমিয়তের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক সিলেট-৫, সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি নীলফামারী-১ ও কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে তাদের মধ্য থেকে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর এবং আন্দালিব রহমান পার্থ এই তিনজন বিজয়ী হন। অবশ্য অন্য শরিকরা পরাজয়ের জন্য তাদের আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকাকে দায়ী করছেন।

বিএনপির নেতৃত্বে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ প্রায় ৪২টি দল অংশগ্রহণ করেছিল। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। যেখানে বলা হয়েছিল, ‘বর্তমান (তৎকালীন) কর্তৃত্ববাদী সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এই রাষ্ট্র মেরামত ও পুনর্গঠন করতে হবে। দেশের জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভের পর ফ্যাসিস্ট সরকার হঠানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় মিত্রদের মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। এ অবস্থায় যুগপতের বাকি মিত্ররা এখন প্রধান শরিকদের কাছে ‘উপযুক্ত মূল্যায়নের’ প্রত্যাশায় রয়েছেন।

জানতে চাইলে ১২ দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিএনপি সরকার ১২ দলীয় জোটসহ আন্দোলনের যারা সাথী, তাদের সবাইকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করবে। কিছু তারা করেছেন, কিন্তু আরও করা দরকার।’

গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালবেলাকে বলেন, শরিকদের ব্যাপারে বিএনপি তার অবস্থান ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যত দিন যাবে, হয়তো পরিস্থিতির আরও পরিবর্তন হবে। বিএনপি হয়তোবা মনে করছে, দুই শরিককে দুটি প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে মোটামুটি জাতীয় সরকার তারা গঠন করে ফেলেছে। এ রকমই একটি পরোক্ষ বার্তা তারা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার চাইলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের শতভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। আর সে মূল্যায়নের সময় তো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সরকার সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে, তারা মনে করলে শরিকদের মূল্যায়ন করবে।

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন প্রসঙ্গে সাইফুল হক বলেন, এটা হয়তো হবে। সেজন্য চার থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। আগে সংসদ বসবে, আলোচনা হবে, বিল উত্থাপন হবে, তারপর এটা আইনে পরিণত হবে, পরে সংবিধানে যুক্ত হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সংসদের উচ্চকক্ষের ব্যাপারে দলগুলো সবাই একমত ছিল। উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হবে, সেটা নিয়ে ভিন্নমত ছিল। বিএনপি এটা চায় জাতীয় নির্বাচনের আসনের অনুপাতে, আর অন্য দলগুলো ভোটের অনুপাতে। বিএনপি যেহেতু এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ, সুতরাং তারা আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ করতে পারে। অন্য দলগুলো হয়তো এর বিরোধিতা করতে পারে। তবে একেবারে না হওয়ার চেয়ে আসনের অনুপাতে হওয়াটাও তো ভালো—এই বিবেচনায় দলগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত এটা মেনে নেবে বলে আমার ধারণা।

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সে অনুযায়ী বিএনপিও সমমনা জোটকে সব সময় আশ্বস্ত করে আসছে যে, তাদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা হবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জোট থেকে একজনকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তখন বিএনপি বাকিদের আশ্বস্ত করে বলেছিল যে, যাদের মনোনয়ন দিতে পারছি না, সরকার গঠন করলে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করব। পরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে এলে আমরা দুবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের দাবি-দাওয়া জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, সরকার গঠন করলে আমাদের মূল্যায়ন করবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি যে, বিএনপি আমাদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করবে।

গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সমন্বয়কারী ও সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. সামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই-সংগ্রামে চারদলীয় জোট গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য রাজপথে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের প্রত্যাশা, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে; তারা সে অপেক্ষায়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ