শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ০৯:০২ পূর্বাহ্ন

রাখাইনে নির্বিচারে গুলি : ইন্টারনেট বন্ধ রেখে জাতিগত নিধনযজ্ঞ

রাখাইনে নির্বিচারে গুলি : ইন্টারনেট বন্ধ রেখে জাতিগত নিধনযজ্ঞ

স্বদেশ ডেক্স: জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি বলেছেন, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। রেডিও ফ্রি এশিয়াকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই অভিযোগ করে বলেছেন, রাখাইনের গ্রামগুলোতে সম্প্রতি নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। এর আগে ২২ জুন রাখাইনে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়ার খবর জানায় মিয়ানমারের এক শীর্ষ টেলিকম কোম্পানি।

এ দিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘের পদ্ধতিগত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। গুয়াতেমালার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গার্ট রোজেনথাল প্রণীত ‘মিয়ানমারে ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের ওপর দেয়া বক্তব্যে বিশ্বসংস্থায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এ ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ আয়োজিত প্ল্যানারিতে তিনি বক্তব্য রাখছিলেন। ‘সুরক্ষার দায়দায়িত্ব (আরটুপি) এবং গণহত্যা প্রতিরোধ, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ : মহাসচিবের প্রতিবেদন’ বিষয়ে প্ল্যানারিতে আলোচনা হয়।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রাখাইনে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সশস্ত্র যুদ্ধ চলছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত নভেম্বর থেকে দু’পক্ষের লড়াইয়ের কারণে রাখাইনের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং প্রতিবেশী শিন রাজ্যের হাজার হাজার লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২২ জুন শনিবার মিয়ানমারের শীর্ষস্থানীয় অপারেটর টেলিনর গ্রুপের বিবৃতির সূত্রে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ সঙ্ঘাত কবলিত রাখাইনে ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়ার পর তা কার্যকর করেছে টেলিকম কোম্পানিগুলো।
ইয়াংঘি লি রেডিও ফ্রি এশিয়াকে বলেছেন, এবার প্রথমবারের মতো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৬ সালে যখন রাখাইন রাজ্যে নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তখন ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি। ২০১৭ সালেও (দ্বিতীয়বারের মতো নিধনযজ্ঞ চালানোর সময়) ইন্টারনেট বন্ধ হয়নি। এবার কেন তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিচ্ছে তা আমি জানি না। নিধনযজ্ঞ চলার সময়ই আমরা বুঝে যাই, এর পরিণাম কী হতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে এরই মধ্যে আমরা যেসব খবর পেয়েছি তা হলো, সম্প্রতি গ্রামগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে, তিন গ্রামবাসী মারা গেছে, অনেকে আহত হয়েছে।’

রেডিও ফ্রি এশিয়ার পক্ষ থেকে ইয়াংঘি লির কাছে জানতে চাওয়া হয়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে সামরিক সঙ্ঘাতে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি সরকারের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মি যে অভিযোগ তুলেছে তিনি তার সঙ্গে একমত কি না। জবাবে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত বলেন, ‘কারা, কী কারণে এটা ঘটতে দিচ্ছে তা নিয়ে কোনো রায় আমি দিতে পারব না। কারণ, মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি নেই আমার, কোনো মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।’
লি অভিযোগ করেন, রাখাইনে কোনো আন্তর্জাতিক সাংবাদিক কিংবা মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের অনুমতি নেই। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার কারণে খুব সীমিত তথ্য তাদের কাছে আসছে। ‘আমি যতটুকু জানি তা হলো ইন্টারনেট বন্ধ আছে, কেউ তা বন্ধ রাখতে বলেছে এবং এখন সেখানে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তাবাহিনী যারা কি না এ নিধনযজ্ঞে জড়িত, তারাই অতীতের নিধনযজ্ঞগুলোতে জড়িত ছিল এবং তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে নিরাপত্তাবাহিনী যা করেছে তার জন্য তারা কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়নি’ বলেন তিনি।

কূটনৈতিক সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে বিভৎস সহিংসতা চালানো হয়েছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তথ্য প্রযুক্তিগত সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকার পর জাতিসঙ্ঘের জন্য এ নৃশংসতার পূর্বসতর্কতা নিরূপণে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসঙ্ঘের প্রতিনিধি এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাতিসঙ্ঘ এ বিষয়ে পূর্বসতর্কতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যাটি ছিল ব্যাপক ও গভীর। এটি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। এখানে পূর্বসতর্কতার জন্য ইঙ্গিতের অভাব থাকার কথা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত নৃশসংতা রোধে সময়োপযোগী পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে, তা রোজেনথালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
রাষ্ট্রদূত মাসুদ রোজেনথালের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলেন, এটি অবশ্যই বলা যেতে পারে যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরের যখন বিশেষ সমর্থন ও ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তখন নিরাপত্তা পরিষদ ও বিশ্বসংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থা যথেষ্ট সমর্থন জোগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় ও সহযোগিতা প্রদানে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের উদারতার কথা উল্লেখ করে স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, ভয়াবহ নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার দৃশ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখছে, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি এই উদারতা প্রদর্শনের জন্য তিনি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ নামে খ্যাতি পেয়েছেন। সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিলে রোহিঙ্গাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা ছিল না। তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যর্থ হতে পারি না। এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারে এবং এর সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মিয়ানমারকে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিজ মারিয়া ফার্নান্দে এস্পিনোসা গার্সেজ প্ল্যানারির উদ্বোধনীতে বক্তব্য রাখেন। ৭০টির বেশি সদস্যরাষ্ট্র আলোচনায় অংশ নেয়।

সীমান্তের জিরো লাইনে মিয়ানমারের দুটি হেলিকপ্টার : নিরাপত্তা জোরদার
বান্দরবান সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের জিরো লাইনের কাছ দিয়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর দুটি হেলিকাপ্টার উড়ে যাওয়ার পর সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বিজিবি। শনিবার সকাল ১০টার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার লেমুছড়ি সীমান্তের কাছে জিরো লাইনের উপর দিয়ে মিয়ানমারের দুটি হেলিকপ্টার উড়ে যায়। তবে হেলিকপ্টার দুটি বাংলাদেশের সীমানা লঙ্ঘন করেছে কি না এ বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। বিজিবি কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। ওই এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, হেলিকপ্টার দুটি বাংলাদেশের সীমান্তের জিরো লাইন অতিক্রম করে উড়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে অংথ্রাবে ১ নং সেক্টরে শনিবার সকালে সামরিক বাহিনীর দুটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইয়ে ওয়াং ও রাখাইন রাজ্যের ডিভিশন কমান্ডার থোন মিওট সীমান্তের ক্যাম্প পরিদর্শন করে।

পরে ১০টার দিকে হেলিকপ্টার দুটি বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার লেমুছড়ি সীমান্তের ৪৮-৪৯ পিলারের কাছে জিরো লাইনের পাশ দিয়ে উড়ে যায়। ওই এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, হেলিকপ্টার দুটি জিরো লাইন অতিক্রম করে বাংলাদেশের কিছু অংশে ঢুকে পড়ে, পরে হেলিকপ্টার দুটি আবার মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। এ দিকে এ ঘটনার পর সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বিজিবি। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের বিজিপির কাছে প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে কি না তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে বিজিবি কক্সবাজার রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, হেলিকপ্টারের সীমান্ত লঙ্ঘন করেছে কি না বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877