শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন

অভিবাসীরা কোথায় নিরাপদ

অভিবাসীরা কোথায় নিরাপদ

স্বদেশ রিপোর্ট: যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে মেক্সিকো সীমান্তে ঠিক এই মুহূর্তে অপেক্ষা করছে কয়েক লাখ মানুষ। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী লোকই সেখানে রয়েছে। এমন শিশুও রয়েছে যাদের সঙ্গে কোনো পরিবার নেই। এই লাখো মানুষের স্বপ্ন একটাই-যে কোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা। জীবন বাজি রেখে, মৃত্যুকে পরোয়া না করে প্রতিদিন বিভিন্ন পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিরামহীন প্রচেষ্টা তারা করে চলেছে।

এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয়েছে, কেউ নিখোঁজ রয়েছেন আবার কারও কারও ঠাঁই হয়েছে মার্কিন শরণার্থী শিবিরে; কিন্তু অভিবাসী-ঢল থেমে থাকেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসার পর এমনই চলছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে এল সালভাদর থেকে আসা বাবা-মেয়ের করুণ মৃত্যুতে যেন মার্কিন কর্তৃপক্ষ একটু নড়েচড়ে বসে। মেক্সিকোর রিও গ্রান্ড নদী পার হওয়ার সময় ২৫ বছর বয়সী বাবা অস্কার অ্যালবার্তো মার্টিনেজ ও ২৩ মাস বয়সী মেয়ের ডুবে মৃত্যু হয়।

স্বামী ও মেয়ের ডুবে যাওয়া মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে মার্টিনেজের স্ত্রী তানিয়া ভানেসা। মার্টিনেজ মেয়েকে নিজের পিঠে টিশার্টের ভেতরে নিয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে। অনেকটা যাওয়ার পর মার্টিনেজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং স্রোতের তোপে ডুবে যায়। এর পর মেক্সিকোর তীরে বাবা-মেয়ের উবু হয়ে পড়ে থাকা ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ ঘটনাটি ২০১৫ সালে তুরস্কের সৈকতে ডুবে মরা আয়লান কুর্দির কথা মনে করিয়ে দেয়। অনেকে মেক্সিকোর বাবা-মেয়ের মৃত্যুকে ‘আয়লানের আমেরিকান ভার্সন’ বলে সমালোচনা করছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ডেমোক্র্যাটরা শরণার্থীদের কল্যাণের জন্য ৪.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিল পাস করে। প্র

থমে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত নিম্নকক্ষ অর্থাৎ প্রতিনিধিসভায় বিলটি পাস হয়। এর পর ধারণা করা হয়েছিল রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে বিলটি আটকে যাবে কিন্তু গত বুধবার সিনেটও বিলটি অনুমোদন করে। সিনেটের অনুমোদনকে ডেমোক্র্যাট নেতারা বলছেন ‘অনিচ্ছা’ সত্ত্বেও তারা বিলটির অনুমোদন দিয়েছে। এখন বাকি রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর। তবে ঠিক এই সময় জাপানে জি-২০ সম্মেলনে থাকা ট্রাম্পও বিলটির প্রশংসা করেছেন। আর বিলটি পাস হলেই যে অভিবাসী সংকট সমাধান হয়ে যাবে তাও নয়। এখন যে মানবেতর জীবনযাপন করছে সেটি লাঘব হতে পারে। তারা যে জীবনের নিশ্চয়তা চাইছে সেটি তো আর এই বিলে নেই। একই সঙ্গে বিলটি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

ডেমোক্র্যাটদের কয়েকজন শীর্ষ নেতার ভাষ্য-ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এ বিষয়ে ভরসা করার কিছু নেই, যে কোনো সময় তারা অবস্থান পাল্টাতে পারে। সব কিছুর পর অভিবাসী সম্পর্কে ট্রাম্পের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ সেখানকার পরিস্থিতিকে মানবেতর করে তুলছে। গত বছর থেকে অভিবাসী পরিবার থেকে শিশুদের আলাদা রাখা হয়েছিল। ট্রাম্পের এ নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনার পর পিছু হটেন তিনি। ইতোমধ্যে শিবিরে থাকা বেশ কয়েকজন শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। এ সংকট নিয়ে কোন পথে হাঁটছেন ট্রাম্প?

সম্প্রতি মেক্সিকোর সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এ চুক্তি অনুযায়ী অভিবাসী সংকটে মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করবে। আর তা না হলে মেক্সিকোর পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে দেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ চুক্তির আওতায় অন্যান্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের প্রতিরোধে দায়িত্ব নেবে মেক্সিকো। তারা যেন মেক্সিকোতে প্রবেশ করতে না পারে এ জন্য মেক্সিকো সরকার অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করবে। অভিবাসীরা যেন মার্কিন সীমান্তে না পৌঁছতে পারে সেটিও মেক্সিকো সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি যেসব অভিবাসীপ্রত্যাশী মেক্সিকোতে অবস্থান করছে তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে ট্রাম্প প্রশাসন। শুধু তা-ই নয়, সেখানে কাজের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করার কথা ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি চিন্তা হলো তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ আশানুরূপ ফল দেবে না। কেননা অভিবাসীরা ‘স্বপ্নের আমেরিকাতেই’ আসতে চায়। মেক্সিকো অথবা অন্য কোনো দেশে ব্যবস্থা করে দিলে সেখানে থাকবে না। এবার একটু তথ্যচিত্রের দিকে চোখ ফেরানো যাক। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩১০০ কিমি পথ। এর মধ্যে ১৬ কিমি এলাকাজুড়ে রয়েছে প্রাণঘাতী রিও গ্রান্ডে নদী আর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে মরুভূমি। নদী ও মরুভূমি দুটোই মৃত্যুফাঁদ।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে ২০১৮ সালে সীমান্ত পাড়ি দিতে ২৮৩ জন মারা গেছেন। এ বছর মার্কিন সীমান্তে ১৩ কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে ৫৯৩,৫০৭ জন আটক হয়েছে। শুধু গত মাসে ১৩২,৮৮৭ জনকে সীমান্ত পেরোতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১১,৫০৭ জন ছিল পরিবারহারা শিশু এবং পরিবারের সঙ্গে ছিল ৮৪,৫৪২ জন শিশু। মূলত মধ্য আমেরিকার দেশগুলো থেকে ছিন্নমূল মানুষেরা সীমান্তে পৌঁছেছে।

বিশেষ করে গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস ও এল সালভাদর থেকে দলে দলে লোকজন যাচ্ছে আমেরিকার দিকে। এর মূল কারণ হলো অতিদরিদ্র, জাতিগত সহিংসতা, অপরাধ কর্মকা- থেকে মুক্তি পেতে হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সীমান্তে অপেক্ষা করছে। আর এখন এদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের মর্জির ওপর।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877