বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০১:০০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ইসরাইলি সামরিক কমান্ড সেন্টারে হিজবুল্লাহর হামলা সুনামগঞ্জে সুরমা ব্রিজে বাস-সিএনজি সংঘর্ষ, বাউল শিল্পীসহ নিহত ২ প্রাণিসম্পদ সেবা সপ্তাহ ও প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক ও মিশিগানে ৩ বাংলাদেশী হত্যা! নিরব কেন কমিউনিটি? কেন্দ্রের নির্দেশ মানে না কেউ, এমপি-মন্ত্রীরা পাত্তা দিচ্ছেন না দলের লিখিত আদেশ কেন্দ্রের নির্দেশ মানে না কেউ, বহিষ্কারের ভয়ও করে না মাঠের বিএনপি গলায় ঢুকে গেল জীবন্ত কৈ মাছ, অতঃপর… সালাহউদ্দিনের দেশে ফেরায় বিলম্বের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘না’তে আটকে যেতে পারে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ ভারতে ৭ দফার লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে কাল
করোনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ

করোনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ

প্রফেসর কর্নেল (অব:) ডা: জেহাদ খান:

কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসক সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা: মইনউদ্দিন করোনাভাইরাসের কাছে হেরে গেলেন। করোনাভাইরাস খুশি এই জন্য যে, তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো এক হাজার বা তার চেয়ে বেশি করোনা রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারতেন। আগের দিনের সম্মুখযুদ্ধে প্রধান সেনাপতি নিহত হলে তার অধীনস্থ সৈনিকদের মনোবল সহজেই ভেঙে যেত এবং তারা পরাজয় বরণ করত। করোনাভাইরাসও টার্গেট করেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী বিভাগীয় শহরে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালের এরকম একজন প্রধান সেনাপতিকে। তার মৃত্যুতে তার সহযোদ্ধাদের মনোবল কেমন থাকতে পারে তা পাঠকের অনুমানের ওপর ছেড়ে দিলাম। এই সেনাপতির যোগ্যতা কেমন ছিল?

একটি মফস্বল শহরের সাধারণ পরিবারের ছেলে হয়েও তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, যা চাট্টিখানি কথা নয়। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পরীক্ষা এফসিপিএস পাস করেছিলেন। এখানেই থেমে থাকেননি। কার্ডিওলজিতে তারপর এমডি ডিগ্রিও তিনি অর্জন করেন। ব্যবহারিক জীবনে তিনি ছিলেন পরিশ্রমী ও সৎ ডাক্তার, মানবিক, সমাজসেবক, আদর্শ শিক্ষক ও দেশপ্রেমিক। তার বন্ধুদের মতো আরো উন্নত জীবনের সন্ধানে তিনি বিদেশে পাড়ি দেননি। করোনাযুদ্ধে এ রকম আহত সেনাপতির সাথে কেমন আচরণ করা হলো? সিলেটের মতো একটি বিভাগীয় শহরে একটি ভেন্টিলেটরেরও ব্যবস্থা করা গেল না তার জীবন বাঁচানোর জন্য। তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তো দূরে কথা, প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাকে একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও দেয়া হলো না। অথচ কিছু দিন আগে যশোর থেকে একজন এসিল্যান্ডকে পায়ের সামান্য হাড় ভাঙার জন্য (Closed fracture TIBIA) হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়েছে, যদিও এ চিকিৎসা ওখানেই করা যেত। তাহলে দুইজন সরকারি কর্মকর্তার চিকিৎসার মধ্যে এত বৈষম্য কেন? কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেল, তিনি নাকি ছাত্রজীবনে ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। কাজেই বোঝা গেল, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সবার সমান নয়। অথচ এই আদর্শ ডাক্তার ধর্ম, বর্ণ, গরিব-ধনী, দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন।

ডাক্তাররা কোনো ধর্মের, দলের বা কোনো জাতির নন। তারা পুরো মানবতাকেই সমানভাবে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, তাদের যুদ্ধবন্দী করা হয় না। কারণ তাদের শত্রু হোক মিত্র হোক সবাইকে চিকিৎসা দিতে হবে। অতীত ইতিহাসে এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। আরব চিকিৎসক হারিস বিন কালাদা পারস্যের জুনদিসপুরে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। তিনি একজন অমুসলিম হয়েও রাসূল সা: ও সাহাবিদের চিকিৎসা করেছেন। দক্ষিণ স্পেনের শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন ইহুদি, হিসদাই ইবন শাপরুত। উত্তর স্পেনের লিওন রাজ্যের রাজা প্রথম সানচোকে (Sancho 1) অতিরিক্ত ওজনের কারণে তার রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ক্ষমতাচ্যুত করে। তৃতীয় আব্দুর রহমান তার ইহুদি চিকিৎসককে খ্রিষ্টান বাদশাহের সাহায্যে পাঠান। তাকে কড়া Dieting করে ওই চিকিৎসক রাজার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনেন। পরে রাজা ক্ষমতাও ফিরে পান। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন ইহুদি, মোসেস মাইমোনাইডস। এটা ওই সময়ের কথা যখন ইবনে সিনা, আল রাজী, আবুল কাসিম আল জাহরাবি, ইবনে জুহর, ইবনে নাফিসের মতো জগদ্বিখ্যাত শত শত মুসলিম চিকিৎসক বর্তমান ছিলেন। এভাবে আগে চিকিৎসকদেরকে ধর্ম, জাতি, দল সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হতো।

ক্রুসেড যুদ্ধে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির প্রতিপক্ষ প্রাণের শত্রু রাজা রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পরেন। সুলতান তার ইহুদি চিকিৎসককে খ্রিষ্টান রাজার কাছে পাঠান। তার চিকিৎসায় রাজা সুস্থ হয়ে উঠেন। সুলতানের উদারতায় রাজা মুগ্ধ হয়ে সন্ধি করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। উদারতা দিয়েই মানুষের মন জয় করা যায়, সঙ্কীর্ণতা দিয়ে নয়। ডা: মইনের চিকিৎসার সাথে জড়িত সিলেটের কর্তাব্যক্তিরা যে সঙ্কীর্ণতার পরিচয় দিয়েছেন তার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পড়তে বাধ্য। তারা শিখবে যে আদর্শ, সৎ, মেধাবী, ভালো ডাক্তার হওয়ার দরকার নেই। রাজনীতির সাথে বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে, তাহলে সহজে হেলিকপ্টার, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে।

পৃথিবীর আর কোনো দেশে দলীয় রাজনীতির সাথে ডাক্তারদের এভাবে জড়িত করার উদাহরণ নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও অন্যান্য দেশের দিকে তাকাই সেখানে ভর্তিপরীক্ষা থেকে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস, চাকরি, প্রমোশন, পোস্টিং সব ক্ষেত্রে শুধু মেধাই হচ্ছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। আমার এক ইহুদি প্রফেসর বলতেন- ‘আমি ভালো ও খারাপ ডাক্তার বলতে কিছু বুঝি না, আমি বুঝি ডাক্তার বা ডাক্তার নয়’। অর্থাৎ, ডাক্তারকে অবশ্যই ভালো হতে হবে। কারণ তাকে মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করতে হয়। গত আট-নয় বছর ধরে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এমনকি মেডিক্যাল কলেজের ভর্তিপরীক্ষায়ও। এতে সব ধরনের শিক্ষার মান অবনতি হতে বাধ্য। দলীয় রাজনীতির কারণে মেডিক্যাল কলেজের পরীক্ষায় পাসের ওপর প্রভাব পড়ছে। একটি হাসপাতালে চিকিৎসায় বিভিন্ন অনিয়ম থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় করা সংক্রান্ত দুর্নীতি, সবকিছুর সাথে দলীয় ডাক্তাররা জড়িত থাকেন।

করোনাভাইরাস দেখিয়ে দিলো- এসব অনিয়মের ফল কী হতে পারে। অপর্যাপ্ত বা মানসম্মত ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষাসামগ্রীর অভাবে সারা দেশে ১৭০ জন ডাক্তার আক্রান্ত এবং ৩০০ জন ডাক্তার কোয়ারেন্টিনে আছে এই লেখা পর্যন্ত। ডা: আব্দুন নুর তুষার জোরালো ভাষায় কিছুদিন আগেই বলেছিলেন, ঢাল-তলোয়ার ছাড়া চিকিৎসকদের করোনাযুদ্ধে পাঠানোর ব্যাপারে। ডাক্তারদের দলীয়করণের পরিণতির দু’টি উদাহরণ দিতে চাই। এক. কিশোরগঞ্জের সরকারি মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল মাসে মাত্র এক-দুইবার কলেজে আসতেন। তাহলে অন্যান্য শিক্ষকের ওপর নজরদারি, ছাত্রদের পড়াশোনা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিশোরগঞ্জের দলীয় সংগঠন বিএমএ অনেক চেষ্টা করেও প্রিন্সিপ্যাল মহোদয়ের কিছু করতে পারল না। কারণ তিনিও দলীয় আশীর্বাদপ্রাপ্ত এবং টাকা দিয়ে সব ঠিক রাখেন। অবশেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে ওই প্রিন্সিপ্যালকে বদলি করা হয়।

দুই. একজন হৃদরোগী হৃদরোগ হাসপাতালে ভর্তি হন। তার জন্য বঙ্গভবন থেকে সুপারিশ করা হয় মহামান্য রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাধ্যমে। তার করোনারি এনজিওগ্রাম করার দরকার ছিল। অথচ তা না করেই তাকে ছেড়ে দেয়া হলো। কিছু দিন পর ওই রোগী আবার বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয় আবারো তাকে এনজিওগ্রাম না করে ডিসচার্জ করে দেয়া হলো। অবশেষে ওই রোগী প্রাইভেট হাসপাতালে এনজিওগ্রাম, বাইপাস অপারেশন করিয়ে তার কষ্ট লাঘব করেন। ওই প্রফেসর বঙ্গভবনের সুপারিশ এই জন্য অবহেলা করতে পারলেন, কারণ- তিনিও দলীয় লোক। এই উদাহরণগুলোর উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়, বরং চিকিৎসকদের দলীয়করণ করলে কী ফল হতে পারে তা তুলে ধরা। করোনা এসেছে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি জোরালো ঝাঁকুনি দিতে। জানি না আমাদের কতটুকু শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। তবে এভাবে যদি চিকিৎসাব্যবস্থা চলতে থাকে, তাহলে আগামী ২০ বছর পর বাংলাদেশে কোনো ভালো ডাক্তার পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সান্ত্বনা শুধু এতটুকু যে, আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অনেককেই ওই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না।

লেখক : মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877